বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটির এই বাজেট প্রস্তাব চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ দশমিক ৫৭ গুণ বেশি। এ ছাড়া সমিতি বিগত ৫০ বছরে আনুমানিক ১ কোটি ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ কোটি কালো টাকা এবং পাচারকৃত ১১ লাখ ৯২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ উদ্ধারের সুপারিশ করেছে। যেখান থেকে সরকারের আয় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অডিটোরিয়ামে ‘বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৪-২৫ : উন্নত বাংলাদেশ অভিমুখী বাজেট’ এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অডিটোরিয়ামে সদ্যনির্বাচিত সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এবং সদ্যবিদায়ী সভাপতি ও বিকল্প বাজেট উপস্থাপন সংস্কৃতির প্রবক্তা অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের উপস্থিতিতে বাজেট উপস্থাপন করা হয়।
সমিতির প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটের আকার (পরিচালন ও উন্নয়ন মিলে) ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। তারা বলছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে (৭০-৮০%) একটি আলোকিত-শক্তিশালী-টেকসই মধ্য-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এ বাজেট উত্থাপন করেছে।
বৈষম্য, অসমতা, দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, মূল্যস্ফীতি হ্রাস, রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণনির্ভরতা কমাতে সুনির্দিষ্টভাবে ২৪ বর্গে ৩৪১টি সুপারিশ করেছে এই সংগঠনটি।
অর্থনীতি সমিতি বিকল্প বাজেটের প্রস্তাবনায় বলেছে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে সরকারকে সেসব উৎসে হাত দিতে হবে, যেসব উৎসে অতীতে কখনো হাত দেওয়া হয়নি অথবা প্রয়োজনমতো হাত দেওয়া হয়নি। যার অন্যতম হলো সম্পদ কর, অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর, অর্থ পাচার ও কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, বিদেশি নাগরিকদের ওপর কর, বিভিন্ন কমিশন ও বোর্ডের আহরণ বৃদ্ধি এবং সরকারের সম্পদ আহরণের প্রচলিত বিভিন্ন উৎসে আদায়ের যৌক্তিক বৃদ্ধি।
অর্থনীতি সমিতির মতে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মধ্যে এখন পরোক্ষ করের ওপর তুলনামূলক বেশি জোর দেওয়া হয়, যা মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ায়। তাই পরোক্ষ করের তুলনায় প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি জোর দিতে হবে এবং দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্য-মধ্যবিত্ত মানুষকে সামনের কয়েক বছর আয়কর বেষ্টনীর বাইরে রাখতে হবে।
অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় থেকে আসবে ১০ লাখ ২৪ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ বাজেট বরাদ্দের ৯২ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাকি ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ, অর্থাৎ ১ লাখ ৭০ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার ঘাটতি অর্থায়ন জোগান দেবে সম্মিলিতভাবে বন্ড বাজার (৯৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা; অর্থাৎ ঘাটতি অর্থায়নের ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ), সঞ্চয়পত্র বিক্রয় থেকে ঋণগ্রহণ (২৫ হাজার কোটি টাকা; ঘাটতি অর্থায়নের ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্ব (৫০ হাজার কোটি টাকা, যেখান থেকে আসবে ঘাটতি অর্থায়নের ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ)।
সমিতির প্রস্তাবে ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণের কোনো ভূমিকা থাকবে না, যা চলতি অর্থবছরের সরকারি বাজেটে ঘাটতি পূরণে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেট অর্থায়নে কোনো দেশি ও বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না।
অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবে বরাদ্দে এবং আনুপাতিক বরাদ্দে উন্নয়ন বাজেট হবে পরিচালন বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি, যা এখন ঠিক উল্টো। এখন উন্নয়ন-পরিচালন বাজেট বরাদ্দের অনুপাত ৩৮:৬২, যা অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটে হবে ৬৬:৩৪। প্রস্তাবনায় উন্নয়ন বরাদ্দ চলমান সরকারি বাজেটের তুলনায় ২ দশমিক ১ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকায় উন্নীত হবে, আর পরিচালন বরাদ্দ (যার ৮০-৮৫ শতাংশ বেতন-ভাতা)।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি অনেক কর্মী। সব জায়গায় বিরাজ করছে দুষ্টচক্র। যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়তে চাই, তাহলে আগে এই দুষ্টচক্রকে রোধ করতে হবে। তা না হলে তারা যেভাবে বিভিন্ন বাজার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, আমাদের অগ্রগতি হবে না। সরকার যেটা চাচ্ছে, সেটাও হবে না। আমরা চাই দুষ্টচক্রকে দমন করে এগিয়ে যেতে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিংয়ে যারা ঋণ দেন, যারা ঋণ নেন তাদের মধ্যেও এ চক্র আছে। এ ছাড়াও কোনো কোনো ব্যক্তি অনেক শক্তিশালী হয়ে গেছে। এদের দমন করতে হবে। আমরা পরামর্শ দিই, কিন্তু আমরা তো আর সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, বাস্তবায়ন করেন, তারা কাজটি করছেন কি না, সেটা দেখতে হবে। তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আরও বলেন, ‘দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারের নীতি শূন্য, কিন্তু দেশে দুর্নীতি বহুল বিস্তৃত। এই জঞ্জাল না সরাতে পারলে কাক্সিক্ষত পথে দেশ এগিয়ে চলা কঠিন হবে। সম্প্রতি দু-একজন রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কারণে শুরু করা পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই।’ তিনি বলেন, ‘আশা করি তা চূড়ান্ত পর্যায়ে যাবে, অতীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে, সে রকম এবারের অভিযান যেন মাঝে থেমে না যায়। বড় বড় দুর্নীতিবাজকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।’
সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাত এখন বৈষম্য সৃষ্টি ও দারিদ্র্য সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। আর কভিড-১৯ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে আমাদের দেশে আসলেই তেমন কোনো শক্তিশালী স্বাস্থ্য খাত নেই। স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান (২০২৩-২৪ অর্থবছরে) সরকারি বরাদ্দ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা। আমরা এই বরাদ্দ ১ দশমিক ৯৪ গুণ বৃদ্ধি করে ৭৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি। আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান ডাইরেক্টরেটের পাশাপাশি আরও একটি ডাইরেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার নাম হবে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ডাইরেক্টরেট’।
