বিভিন্ন প্রভাব ফেলবে

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৪, ১২:২৭ এএম

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফল থেকে সুস্পষ্ট, গণমাধ্যমের ওপর প্রচণ্ড নীরব খবরদারিত্ব নির্মাণ করে বিশ্ব জুড়ে পুনরায় বিজয়ী হওয়ার যে ঢেউ হিন্দুত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী বিজেপি সৃষ্টি করেছিল, ভারতের জনগণ তাতে গা ভাসায়নি। বিজেপি যে কর্র্তৃত্ববাদী রাজনীতি ও শাসন উৎপাদনের সূচনা করেছিল, জনগণ বরং তার প্রতিক্রিয়ায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। দুই-দুইবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা এ দলটির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা। এই নির্বাচন এ ইঙ্গিতও দিচ্ছে যে, সেখানকার জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের হারানো প্রাসঙ্গিকতা ফিরে আসছে। দীর্ঘ ১০ বছর পর আবারও এ দলটি লোকসভায় প্রায় ১০০টি আসন পেয়েছে যা কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের নিঃসন্দেহে উজ্জীবিত করে তুলেছে।  এটিও নিশ্চিত যে, এককভাবে সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলেও, জোটে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক মেরূকরণ না ঘটলে বিজেপিই তার মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আগামী ৫ বছরের জন্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেতে চলেছে। লোকসভায় এককভাবে কমপক্ষে ৩৭০টি আসন পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রচারাভিযানে নামা নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির দুর্গগুলোয় কী করে ফাটল ধরল, কী করেই বা কংগ্রেস তার হারানো স্থান খানিকটা হলেও ফিরে পেল, তা নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক আলোচনা হবে। কিন্তু আমাদের জন্য বোধকরি সে সবের পাশাপাশি এটিও পর্যবেক্ষণ করা দরকার, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফল, বিজেপির এই টালমাটাল বিজয় কি কোনো প্রভাব ফেলতে চলেছে? এক কথায় বলতে গেলে বিজেপির টালমাটাল বিজয় এবং কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন, বাংলাদেশের সরকার ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে। 

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ যেন সরকার গঠন করতে পারে, সে ব্যাপারে ভারতের মোদি সরকারের প্রায়-প্রকাশ্য একটি অবস্থানও ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের শেকড় যেমন অনেক গভীরে পৌঁছেছে, তেমনি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এককথায় বলতে গেলে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে গত কয়েকটি পর্বে ভারতের বিজেপির কাছ থেকে সর্বাত্মক রাজনৈতিক সহায়তা পেয়েছে।  রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এটি ভালো করে বলতে পারবেন যে, বিজেপি যেমন ভারতে, আওয়ামী লীগ তেমনি বাংলাদেশে কর্র্তৃত্ববাদী রাজনীতির আদলে শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে পরস্পরের কতটুকু পরিপূরক হয়ে উঠেছে।  কিন্তু সাধারণভাবে এটি বলাই যায়, রাজনৈতিক আদর্শগত ক্ষেত্রে যত দূরত্বই থাক না কেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এই কর্র্তৃত্ববাদী রাজনৈতিকতার সূত্রে গাঁথা দুটি দলই চাইবে পরস্পর পরস্পরের আস্থাভাজন হয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিই দুই দেশের পররাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে ভারসাম্যহীন করে তুলতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও তা প্রভাব ফেলতে পারে।  কেননা প্রথমত. টালমাটাল বিজয়ের কারণে বিজেপিকে এবার সরকার গঠনের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের গড়ে তোলা জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএর ওপর; আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দুটি দল নীতিশ কুমারের নেতৃত্বাধীন বিহারের জনতা দল ইউনাইটেড ও চন্দ্রবাবু নাইডুর নেতৃত্বাধীন অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টির ওপর। আরও বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দলও এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিজেপির ভাগ্য নির্ধারণে। আবার জোট সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাও নরেদ্র মোদির নেই; ভারতের মতো বিরাট (আয়তন, জাতি, জনসংখ্যা সর্বার্থেই) একটি দেশে শরিক দলগুলোকে নিয়ে সরকার পরিচালনায় গিয়ে তাকে কী ধরনের সংকটে পড়তে হবে, তা আগে থেকেই বলা সম্ভব নয়।  সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে জনগণকে পক্ষে রাখার ও টানার জন্য, আসন্ন শাসনামলে টিকে থাকার প্রশ্নে বিজেপিকে আরও উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকতে হবে। যা অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়বে। কর্র্তৃত্ববাদী এবং হিন্দুত্ববাদী শাসনের সূত্রে ভারত রাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আগের চেয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে উঠবে। যার বাড়তি চাপ পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপর। দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নানা কূটনৈতিক সংকট ও দূরত্বের সময় ভূমিকা রাখার যে সক্ষমতা বিজেপি প্রকাশ করেছিল, সামনের দিনগুলোয় বোধকরি নতুন সরকার তা আর দেখাতে পারবে না কিংবা দেখাতে চাইবেও না। এর ফলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অমীমাংসেয় ইস্যুগুলোর কারণে শীতল হয়ে ওঠা সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে উঠতে পারে। মানবাধিকার পরিস্থিতি, ভিসা নীতি, স্যাংশন এইসব ইস্যু আরও জটিলাকার ধারণ করতে পারে। পরিবর্তিত কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীনের দিকে বাংলাদেশের আরও ঝুঁকে পড়ার বাস্তবতা দেখা দেবে। আর তাতে কী যুক্তরাষ্ট্র, কী ভারত উভয়ের সঙ্গেই আবার বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দিতে পারে। তৃতীয়ত, বিজেপি নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে বাংলাদেশকে খুশি করার মতো যে দু-একটি বিষয়ে হয়তো পদক্ষেপ নিতে পারত, তা বাস্তবায়ন করা সামনের দিনগুলোয় আরও কঠিন হয়ে পড়বে কিংবা কোনোটি হয়তো সম্ভবই হবে না। যেমন, তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যু ঝুলে থাকবে।

এমন একটি প্রচার আছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে সেখানকার কেন্দ্রীয় সরকার বা নরেন্দ্র মোদির পক্ষে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন করা যায়নি। বিষয়টি যদি এমনই হয়ে থাকে, তাহলে বলা চলে, বাংলায় মমতার তৃণমূল এবার নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করায় তিস্তার পানি সমস্যার নিষ্পত্তি আরও অসম্ভব হয়ে পড়ল। রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বিজেপি এই দফায় বোধকরি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার উত্তপ্ত ইস্যুগুলো যেমন সীমান্তে অহরহ বাংলাদেশের মানুষ হত্যার মতো প্রসঙ্গগুলো আগের মতোই ঝুলিয়ে রাখবে এবং এখানকার বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের দিকেও যাত্রা করবে। চতুর্থত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সহায়তার সূত্রে এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনৈতিক আদর্শের কারণে বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই নিবিড়। কংগ্রেসের এই সাফল্য তাই এ দেশের এবং আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষবাদী ব্যক্তিদের খানিকটা হলেও উজ্জীবিত করেছে। কেউ কেউ এমনও মনে করছেন যে, আঞ্চলিক দলগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করলে এবং নরেন্দ্র মোদি জোট সরকার পরিচালনায় ব্যর্থ হলে কংগ্রেসের সরকার গঠনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া এমনকি কংগ্রেস সরকার গঠন করলেও ভবিষ্যতে ভারতের বাংলাদেশ-নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। কাজেই বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের উল্লসিত হওয়ার মতো কিছু নেই তাদের জায়গাটি তাদের নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে।  তাদের এটিও বিবেচনায় নিতে হবে, ইতিমধ্যেই কর্তৃত্ববাদী অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে আওয়ামী লীগ সেক্যুলারিজমের পোশাক পরে থাকলেও কার্যত মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং দলেও মৌলবাদীদের জায়গা দিতে শুরু করেছে। বিজেপি সরকার যে টিউনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে, সরকার গঠন করলে ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেস জোটও একই টিউনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেবে। এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের জন্য তা কোনো আশার আলো জ্বালবে না। তবে একথা জোর দিয়েই বলা চলে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের জনগণ যেভাবে সরকারি প্রচারণা উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং ভূমিকা রেখেছে, তা শুধু বাংলাদেশ নয় প্রতিটি দেশের জন্যই অনুপ্রেরণার।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত