জিয়াউর রহমানের ‘উৎপাদনের রাজনীতি’তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠেছিল ছাত্রদল। ‘উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের লক্ষ্য’ স্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ছাত্রদল জিয়ার উন্নয়নের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। জিয়াউর রহমান বুঝেছিলেন, স্বাধীন দেশে উৎপাদন ও উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন মেধাবী রাজনৈতিক নেতৃত্বের।
‘শিক্ষা ঐক্য প্রগতি’কে ব্রত করে তিনি ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার মাঝে জায়গা করে নেয় ছাত্রদের এই সংগঠন। ১৯৮০ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি হল সংসদে ছাত্রদের ভোটে জিতে যায় ছাত্রদল। ১৯৮১ সালের ডাকসু নির্বাচনে প্রায় সব হলে একচেটিয়া বিজয় পায় তারা। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে নিয়ামক ভূমিকা ছিল তাদের।
৪৫ বছরের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একসময়ের ‘সমীহ জাগানো’ এই ছাত্রসংগঠন যেন নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে। ছাত্ররাজনীতিতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠন। বিএনপির সরকার পতনের আন্দোলনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে না পারায় নিষ্ক্রিয় কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনা হলেও অবস্থার তেমন বদল ঘটেনি। ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের অবস্থানই নেই। গত এক বছরে অবস্থান তৈরির চেষ্টাও দেখা যায়নি।
ছাত্রদলের ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি এখন নেই বললেই চলে। ছাত্ররা প্রায় ভুলতে বসেছে এই সংগঠনকে। ক্যাম্পাসকে বাদ দিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনকে তাদের রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে ছাত্রদল।
ছাত্ররাজনীতির প্রধান কেন্দ্র ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন বছর ধরে ছাত্রদলের কার্যক্রম নেই। সর্বশেষ ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে গেলে ছাত্রলীগের অতর্কিত হামলার শিকার হন ঢাবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। ২০২৩ সালে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে ফেরার পথে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন সংগঠনের কয়েকজন নেতা। এরপর ক্যাম্পাসের আশপাশে কিছু ঝটিকা মিছিল করলেও আন্দোলন গড়ে তোলায় কিংবা শিক্ষার্থীদের পক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা করতে দেখা যায়নি তাদের।
চলতি বছর নতুন কমিটি ঘোষণার দুই মাস পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত সংগঠনটি ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান সাংগঠনিক কর্মসূচি নিতে পারেনি, এমনকি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারছে না। কোন কর্মসূচিতে না গিয়ে ক্যাম্পাসভিত্তিক কয়েকটি ঘটনায় শুধু প্রেস রিলিজ দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছেন শীর্ষ নেতারা। গত ২৫ মে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের জন্মবার্ষিকীতে ফুল দিতে এসে তারা ছাত্রলীগের সঙ্গে আপস করেছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা গত দুই বছরে দুইবার প্রবেশ করতে পেরেছেন। তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কল্যাণে। ইফতার মাহফিল আয়োজন ছাড়া আর কোনো চেষ্টাও করতে দেখা যায়নি তাদের। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ছাত্রদলের অবস্থান নেই।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আগে প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকলেও একদম হারিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। অথচ বর্তমানে ছাত্রদলের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটছে। ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আকিল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত চার বছরে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে একবারের জন্যও আমাদের পক্ষে কোনো আন্দোলনে পাইনি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংযোগ না থাকলে সেই সংগঠন কিংবা তাদের আদর্শ সম্পর্কে জানার সুযোগও থাকে না। ক্যাম্পাসে ছাত্রদল সম্পর্কে ভালো ধারণা নেই।’
ছাত্রদলের একটি সূত্র বলেছে, পল্টনমুখী রাজনীতিতেই বিশ্বাস করে ছাত্রদল। ক্ষমতায় না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার কোনো আলোচনা নেই। বলাবলি হচ্ছে, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের কবজায় ছাত্রদল। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে ছাত্রদলের রাজনীতি। তিনি ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসমুখী করতে চান না।
ছাত্ররাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রদলের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা না থাকার বড় কারণ এর নেতাদের বয়স; নিয়মিত ছাত্র না হওয়াও কারণ বটে। ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ঢাবির ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এখন চলছে ২০২৩-২৪ সেশন। প্রায় ১৭ বছরের গ্যাপ। সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের শিক্ষাবর্ষ ২০০৭-০৮। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে আরও ১৬টি ব্যাচ। দীর্ঘ গ্যাপের কারণে ছাত্রবান্ধব রাজনীতিতে নিজেদের জড়াতে পারছেন না এই সংগঠনের অনেক নেতা।
নিজেদের হারিয়ে খুঁজছেন, এ কথা বলতে নারাজ ছাত্রদলের নেতারা। তারা বলছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের ন্যূনতম স্পেস রাখেনি এ সরকার এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাসগুলোতে প্রবেশ করতে চাইলেই হামলার শিকার হচ্ছেন তাদের নেতাকর্মীরা। তবে নতুন কমিটি গঠনের পর আবারও ক্যাম্পাসগুলোতে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে আন্দোলন সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসগুলোতে গণতন্ত্র চর্চার ন্যূনতম অবকাশ নেই। যখন আমরা মিছিল সমাবেশ করতে কিংবা প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে যাই, তখনই ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালায়। তবে আমরা থেমে নেই। ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ কায়েম এবং শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীদের পাশে কীভাবে থাকা যায় তার কর্ম পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।’
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদল ক্যাম্পাসমুখী একটি সংগঠন। ছাত্রদল গণতন্ত্রের আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় সংগঠন। আর ছাত্রলীগ ফ্যাসিবাদের পাহারাদার। তারা প্রশাসনের সহযোগিতায় জঙ্গি স্টাইলে ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। দেশনায়ক তারেক রহমান আমাদের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করতে বলেছেন। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি।’
ঢাবিতে কর্মসূচি পালন করতে না পারার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কোনো ক্যাম্পাসেই ছাত্রদলকে রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে গেলেই ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় আমাদের ওপর হামলা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রক্তে রঞ্জিত হলেও একটি ঘটনারও বিচার প্রশাসন করেনি। এরপরও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে ছাত্রদল কার্যক্রম পালনের চেষ্টা করছে।’
ছাত্রদলের এমন দুরবস্থার বিষয়ে বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতিতে দুঃসময় আসেই, তারপরও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে হবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে নিষ্ঠুর হয়ে ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসে প্রবেশের সুযোগই দিচ্ছে না এ সরকার এবং সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এলে এমন পরিস্থিতি থাকবে না।’
