সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কালো তালিকাভুক্ত হচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০২:৪৬ এএম

বিশ্বজুড়ে নানা পক্ষের চেষ্টা ও চাপের পরেও গাজায় হামলা বন্ধ করেনি ইসরায়েল। এমনকি জাতিসংঘ যেদিন গাজার শিশুদের হত্যার জন্য ইসরায়েলি বাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে সেদিন অন্তত ৫৭ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। গত শুক্রবার মধ্য গাজার বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত হয়েছে আরও কয়েকশ মানুষ; যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আলজাজিরা বলছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজায় যেভাবে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল তাতে করে আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো জায়গাই হাসপাতালে খালি নেই।  আল-আকসা হাসপাতালের চিকিৎসরা বলছেন, পুরো হাসপাতাল কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। ক্ষতবিক্ষত লাশ আর আহত মানুষে ভরে উঠছে হাসপাতালের প্রতিটি জায়গা।

এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, গাজায় হামাসের হাতে জিম্মি চার ইসরায়েলিকে জীবিত উদ্ধার করেছে তারা। এই জিম্মিদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে নজিরবিহীন হামলা চালানোর সময় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের যোদ্ধারা সুপারনোভা সংগীত উৎসব থেকে এদের ধরে গাজায় নিয়ে জিম্মি করে রেখেছিল।

গতকাল আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের ক্ষতি করার দায়ে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘ। যুদ্ধনীতি ভেঙে যেসব দেশ শিশুদের ওপর চড়াও হয়েছে, সেসব দেশকে নিয়ে এ তালিকা করেছে সংস্থাটি। নিরাপত্তা পরিষদের সভায় উত্থাপনের পর সপ্তাহখানেক বাদে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার কথা রয়েছে। 

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরদান গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাদের সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে এ-সংক্রান্ত এক ফোনকলের ভিডিও এক্সে তিনি প্রকাশ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। গিলাদকে জাতিসংঘের ওই সিদ্ধান্তের কথা জানাতে ফোন করেছিলেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা। এ সময় গিলাদ ফোনকলে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং এর অংশবিশেষ এক্সে পোস্ট করেন। ভিডিও কলে গিলাদকে দাবি করতে শোনা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী ইসরায়েলের। এ সময় তিনি আন্তোনিও গুতেরেসকে কালো তালিকাভুক্ত একমাত্র মহাসচিব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার দাবি, গুতেরেস সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করেন এবং তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেন। তিনি জাতিসংঘের এমন সিদ্ধান্তকে আপত্তিজনক ও ভুল পদক্ষেপ বলেও উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের এমন আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্টিফেন ডুজারিক। তিনি বলেন, তার ২৪ বছরের চাকরিজীবনে কোনো কূটনীতিককে এমন অপেশাদারি আচরণ করতে দেখেননি। ডুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের প্রতি আইন লঙ্ঘনকারী দেশগুলোর তালিকা সংবলিত একটি প্রতিবেদন ১৪ জুন নিরাপত্তা পরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর কয়েক দিন পর এ সিদ্ধান্তের কথা জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। তালিকায় ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর নামও রয়েছে।

জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিন কর্র্তৃপক্ষ। এ কর্র্তৃপক্ষের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রিয়াদ মালিকি এক বিবৃতিতে বলেছেন, অনেক বিলম্বে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাজায় কোন ধরনের বিপর্যয় চলছে, তা বিশ্ব এখন খালি চোখেই দেখছে। সেখানে গণহত্যা চালানো হচ্ছে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

মালিকি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত না করতে জাতিসংঘ মহাসচিবের সামনে আর কোনো অজুহাতের পথ খোলা ছিল না। 

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় খাদ্য, পানি, ওষুধ, এমনকি অতি জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে বাধা দিয়ে আসছে। এতে সেখানে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গাজার অনেক অংশে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের প্রতি ১০ শিশুর ৯ জনই তীব্র খাবার সংকটে ভুগছে।

ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। সংস্থাটির মানবিক নীতি ও পরামর্শবিষয়ক বিভাগের প্রধান আলেকজান্দ্রা সায়েহ বলেন, ‘এটা সত্যিকারের লজ্জাজনক ঘটনা যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পর্যন্ত গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারল না।

আলেকজান্দ্রা সায়েহ বলেন, জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে পথ তৈরি করবে। তবে একই ধরনের অপরাধে (ক্ষতি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে না পারা) ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জ-দিন আল-কাসাম ব্রিগেড ও আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক জিহাদকেও কালো তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে গাজার মধ্যাঞ্চলীয় আল-নুসেইরাত শহরের দুটি পৃথক স্থান থেকে চার জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। তারা সুস্থ থাকলেও মেডিকেল পরীক্ষার জন্য তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে শনিবার জানিয়েছে তারা।

রয়টার্স জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত জিম্মিদের নোয়া আরগামানি (২৫), আলমোগ মেইর জান (২১), আন্দ্রে কোজলোভ (২৭) ও সেøামি জিভ (৪০) বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে আরগামানি নারী।

ওই আক্রমণের পর ওই দিন থেকেই হামাস শাসিত গাজায় ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েল। তারপর থেকে আট মাস ধরে চলা তাদের অবিরাম নির্বিচার হামলায় গাজা ভূখণ্ড ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, নিহত হয়েছে ৩৬ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি যাদের অধিকাংশই বেসামরিক।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত