উত্তরাঞ্চলে নিয়মিত বন্যার কারণ কী?

আপডেট : ২২ জুন ২০২৪, ০৭:০৩ পিএম

বর্ষা আসলেই আতঙ্কে দিন কাটে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার নদীতীরবর্তী মানুষের। কারণ প্রত্যেক বছরেই আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়িসহ ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এমনকি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এবছরেও বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ে চর, দ্বীপ চর ও নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২০ হাজার পরিবার। একইসঙ্গে উজানের ঢলে লালমনিরহাট, গাইবান্ধাসহ কয়েকটি জেলায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে ফসলি জমিসহ ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। 

প্রতিবছর এই বন্যার কারণ কী? বন্যা যদি প্রতিবছর হয়েই থাকে তাহলে নদ-নদীর পানিপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি নিয়ে কী করেন সংশ্লিষ্টরা। বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবাহ ঠিক রাখতে কতটুকু নদী খনন করা হয়, এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। কিংবা বন্যার হাত থেকে মানুষদের বাঁচাতে যে বাঁধ দেওয়া হয় তা কতটা কার্যকর?

নদী গবেষকরা মনে করেন, এখন প্রত্যেকটি নদী থেকে শুস্ক মৌসুমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে প্রভাবশালীরা। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও উজানের ঢলে নদীতে পলি জমে। নিয়মিত নদী খনন না করায় এই পলি জমে নদী নাব্যতা হারায়। তাই উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টি হলেই তা বন্যায় রূপ নেয়। এতে নদীতীরবর্তী হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর থেকে বাঁচতে নদীর নাব্যতা ফিরিতে আনার তাগিদ দেন নদী গবেষকরা। 

কিছুদিন আগে ভারতের রিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আরআরআই) তিস্তা নদীর গতিপথ বদলানো নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছে। সেই সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদীর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রধান পরিবর্তন তিস্তা নদীতে ৫-৭ ফিট করে পলি পড়েছে। তিস্তা নদীর কোথাও এখন আর গভীরতা নেই। তিস্তা নদী এখন পুরোপুরি নাব্য সংকটে পড়েছে। 

সমীক্ষা আরও বলা হয়, চলতি মৌসুমে খরাস্রোতা তিস্তা বর্ষায় বিস্তৃণভাবে প্রবাহিত হয়ে ভয়াল রূপ ধারণ করতে পারে। ইতোমধ্যে সেই রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধাসহ কয়েকটি জেলা বন্যা দেখা দিয়েছে। এদিকে আগামী ৭২ ঘণ্টায়  দেশের উত্তরাঞ্চলে দুধকুমার, তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

তারা আরও জানান, এই সময়ে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার কিছু নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। রংপুর জেলার কিছু নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতিও হতে পারে।

বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাচ্ছে, অনেক জায়গায় চর পড়ে গেছে। শুকনোর সময় প্রায় হেঁটে পার হওয়া গেলেও বর্ষার সময় এসব নদীতে উজান থেকে এক লাখ কিউসেকের বেশি পানি চলে আসে। বিশেষ করে শুষ্ক সময়ে উজানে ভারতের অংশে পানি সরিয়ে নেওয়া হয় আর বর্ষার সময় সেই পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে বর্ষা আসলে নদীর গতিপথ পাল্টে যায়, দুকুল উপচে পানি পড়ে। ফলে অল্প বৃষ্টি হলেই বা নদীতে পানি বাড়লেই বন্যা দেখা দেয়।

এর পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার মতো নদীগুলোর উজানে অনেক স্থানে মাইনিং হচ্ছে, সেসব কারণে নদীতে প্রচুর পলি, বালু বা পাথর এসে পড়ে। এগুলো পানির সাথে সাথে ভাটির দিকে চলে আসে। ড্রেজিং করেও পুরোপুরি মোকাবেলা করা যায় না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও অনেক জায়গায় জলাশয় ভরে ফেলছি, দূষণ আর দখলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হলে পানি সহজে বের হতে না পেরে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানে নদীর নাব্যতা রক্ষা করা, দূষণ আর দখল ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত