চাহিদার চেয়ে দেশে অতিরিক্ত ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হওয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ খাতে আরও ৫টি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে। এগুলো হলো উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুতের লোডশেডিং, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়নে ধীরগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কম নজর দেওয়া, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্দশা।
গতকাল রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইন সেন্টারে আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
মূল প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে সংস্থাটির পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট, যা প্রয়োজনের চেয়ে ১৪ হাজার (প্রায় ৪৬ শতাংশ) মেগাওয়াট বেশি। এত বিদ্যুৎ ২০৩০ সালেও লাগবে না। তখন চাহিদা দাঁড়াবে ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এর সঙ্গে ২৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন ধরলেও ২৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট হলেই হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুতের কারণে ২০২৫ সাল নাগাদ পিডিবির লোকসান ১৯৬ শতাংশ বেড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, একদিকে সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট এবং বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে শীতকালেও লোডশেডিং হচ্ছে। আবার ব্যয়বহুল সত্ত্বেও সরকার জ্বালানি আমদানি বাড়িয়ে যাচ্ছে। উচ্চমূল্যের জ্বালানি থেকে আমদানি কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে আরও বেশি আন্তরিক হতে হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন তিনি।
বাজেটে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত নিয়ে স্পষ্ট কিছু নেই উল্লেখ করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘টেকসই জ্বালানি এবং জ্বালানি রূপান্তরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাতীয় বাজেট হওয়া দরকার। সঠিক পরিকল্পনা, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া জ্বালানির স্থায়িত্ব ও রূপান্তর কোনোটাই অর্জন করা যাবে না।’
এবারের বাজেটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অহেতুক উচ্চাভিলাষী বিদ্যুৎ চাহিদার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কিছু পরিবর্তন ও টেকসইবিরোধী উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয় সিপিডির প্রতিবেদনে।
সিপিডি বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ফেজ-আউট, দ্রুত ভাড়াচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ, ক্যাপাসিটি পেমেন্টের অবসান এবং আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তিকে উৎসাহিত করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে বাজেটে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব প্রশংসনীয়। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক। তবে আমদানি করা এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মূল্য পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ইস্যুতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি।
অনুষ্ঠানে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাসের কথা বলে দাম বাড়ানো হলেও লোডশেডিং কমেনি। ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানা সচল রাখতে উচ্চমূল্যের ডিজেল ব্যবহার বাড়ছে। সেই সঙ্গে গ্যাসের মূল্যও বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি বেড়েছে। এতে অনেক কোম্পানি বসে গেছে। সামগ্রিকভাবে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে বাজেটে যে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা আদৌ জোগাড় হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
‘এরপরও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে সরকার। ৪ হাজার থেকে এখন ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতো না। কাজ করতে গেলে কিছু ভুলত্রুটি হবে, তা সংশোধন হচ্ছে, আরও হবে।’ যোগ করেন তিনি।
এ কে আজাদ বলেন, ‘সরকারের জুনিয়র কর্মকর্তা এসি ল্যান্ড, ইউএনওর জন্য বিদেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার পাজেরো ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি আনা হচ্ছে। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের মন্ত্রীরা কিন্তু তাদের দেশীয় তৈরি গাড়ি ব্যবহার করেন। আমাদের দেশের বড় বড় সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে গাড়ি-পেছনে গাড়ি। খালি গাড়ির পর গাড়ি। কারণ স্যার যাচ্ছেন তার জন্য সরকারি কয়েকটা গাড়ি লাগবেই। তাদের অফিসও করতে হয় না। দেশের স্বার্থে সরকারি এই অর্থের অপচয় বন্ধ করা জরুরি। সরকারের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়।’
বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আমরা শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিয়েছি। জ্বালানির ঘাটতি এবং কিছু কিছু জায়গায় সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতার কারণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সরকার এটা নিয়ে কাজ করছে। নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ করাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়া কেউ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করবে না। এ জন্য পিডিবির লোকসান অতটা বাড়ছে না। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতার কারণেই মূলত আর্থিক চাপ বেড়েছে পিডিবির।
বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, এমন অভিযোগ করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের নামে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি সমন্বয় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি প্রমাণ হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের একক দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হলেও বিপিসি তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে। এটা নিয়ে আদালতে মামলা করেছি। পরে আইন পরিবর্তন করে রাষ্ট্র এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিকে সুরক্ষা দিয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিদ্যুৎ কিনছে। আবার কমিশনকে পাশ কাটিয়ে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে সরকার।’
শামসুল আলম বলেন, ‘কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিদেশ ভ্রমণ, ঘুষের টাকা, কমিশন সবই জনগণের টাকা থেকে মেটানো হলেও জনগণের কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে এই বাজেট এলেই কি আর গেলেই কি, তাতে কারও যায়-আসে না; বরং বাজেটে যত বেশি বরাদ্দ বাড়বে, তত বেশি লুণ্ঠন হবে। পুরো জ্বালানি সিস্টেম সম্পর্কে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা অস্পষ্ট।’
তিনি বলেন, ‘মুখে ভালো ভালো কথা বললেও ভেতরে অনুধাবন না করার কারণে ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয় না। সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়া এবং জিরো লোডশেডিংএই দুটি সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল। তা অর্জনে সরকার শতভাগ ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা নিয়ে কি করে সরকার ঘুমায়? কী করে প্রতিনিধিরা গর্ব করে? তার মানে আমরা জনগণ মূর্খ।’
বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, ‘১৯৯৬ সালের জ্বালানি নীতিমালা এখন কাজ করবে না। সবার আগে একটি আধুনিক টেকসই জ্বালানি নীতিমালা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বিইআরসিকে শক্তিশালী করতে হবে। তা না করে শুধু জোড়াতালি দিয়ে পরিকল্পনা করার কারণে এগুলো একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে। বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের যে বিশেষ ক্ষমতা আইন রয়েছে, সেটি দ্রুত বাতিল করতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকলে সৌরবিদ্যুতের দাম ১০ সেন্ট (প্রায় ১২ টাকা) থেকে ৭ সেন্টে (প্রায় ৮.৪ টাকা) নামানো সম্ভব।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের রেক্টর মোহাম্মদ আলাউদ্দিনসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।
