বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অস্থিরতা কয়েক বছর ধরেই চলছে। ঋণখেলাপি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল নীতির ফলে এ খাতের তারল্য সংকট দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়েও। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে বেশ কয়েক বছর ভালো অবস্থানে গিয়েছিল এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের উদ্যোগ। কিন্তু চলতি অর্থবছর দেশের ব্যাংক খাতের অস্থিরতা আরও প্রকট হওয়ায় এই উদ্যোগ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন গ্রাহকরা।
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের আর্থিক লেনদেনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম এজেন্ট ব্যাংকিং। কয়েক বছর ধরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রচার ও প্রসার। বাড়ছে হিসাব ও আমানত। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কমেছে লেনদেন ও ঋণ বিতরণ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মার্চের তুলনায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। লেনদেন কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৪১ লাখ ৪৬ হাজার ৩০৩টি। লেনদেনের পরিমাণ ৬৭ হাজার ৪৫৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। মার্চে লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৫ হাজার ১৭১টি। লেনদেন হয়েছিল ৭২ হাজার ৯৫৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। সে হিসাবে মার্চের তুলনায় এপ্রিলে লেনদেনের সংখ্যা কমেছে ১১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৮টি। লেনদেন করা টাকার পরিমাণ কমেছে ৫ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিলে শহরাঞ্চলে লেনদেন হয়েছিল ১৫ হাজার ৯৫৫ কোটি ও প্রন্তিক পর্যায়ে লেনদেন হয়েছে ৫১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা; যা মার্চে শহরে লেনদেন ছিল ১৫ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, গ্রামে লেনদেন হয়েছিল ৫৬ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এজেন্টগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৭২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা; যা গেল মার্চে ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ৮৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলে ঋণ বিতরণ কম হয়েছে ১৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে এই সময়ে শহরের থেকে গ্রাম বা প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ বেশি কমেছে। এই সময়ের মধ্যে শহরের এজেন্টগুলো বিতরণ করেছে ২৪৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা; যা মার্চে ছিল ৩০৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ঋণ বিতরণ কমেছে ৬২ কোটি টাকা। এ ছাড়া এপ্রিলে গ্রামের এজেন্টগুলো বিতরণ করেছে ৪৭৮ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা মার্চে ছিল ৫৭৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সে হিসাবে কমেছে ১০০ কোটি টাকা।
তবে লেনদেন ও ঋণ বিতরণ কমলেও বেড়েছে আমানত ও হিসাবসংখ্যা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল শেষে হিসাবসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৩২ হাজার ১৪৭টিতে; যা মার্চে ছিল ২ কোটি ২২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৩টি। হিসাবসংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ৮৩ হাজার ১১৪টি। হিসাবগুলোর মধ্যে শহরের হিসাবের সংখ্যা ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪টি এবং গ্রামে রয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩টি হিসাব। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে তুলনামূলক পুরুষের সঙ্গে নারীদের হিসাব খোলার প্রবণতা বেশি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে এপ্রিলে পুরুষ হিসাব দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৩৪০টি, যা মার্চে ছিল ১ কোটি ৮ লাখ ৬৩ হাজার ৭৩১টি। হিসাব বেড়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৯টি। অপরদিকে এপ্রিলে নারীদের হিসাব রয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৯১৮টি, যা মার্চে ছিল ১ কোটি ১০ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৮টি। হিসাব বেড়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৮০টি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। মার্চে আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৯৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আমানত বেড়েছে ৮৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের ক্ষেত্রেও শহরের চেয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ এগিয়ে রয়েছে। এপ্রিলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে শহরাঞ্চলের মানুষের আমানত দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, যা মার্চে ছিল ৭ হাজার ৪২ কোটি টাকা। আমানত বেড়েছে ৩০৭ কোটি টাকা। অপরদিকে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের এপ্রিলে আমানত দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা, যা মার্চে ছিল ২৯ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। আমানত বেড়েছে ৫৪৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ৩১টি ব্যাংকে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সেবা চালু রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্টের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮৩৫টি। আর পরের মাস এপ্রিল শেষে এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮৪০টিতে। এর মধ্যে শহরের এজেন্ট রয়েছে ২ হাজার ৫০৫টি এবং গ্রামে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শাখা রয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৫টি। অপরদিকে, মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ছিল ২১ হাজার ৬১৩টি। আর এপ্রিল শেষে আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৫১৭টিতে। এসব এজেন্ট ও আউটলেটের প্রায় অধিকাংশই গ্রামে।
