গ্রেনেড হামলা, মানি লন্ডারিংসহ দুর্নীতির একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে (তারেক জিয়া) প্রাপ্য সাজার মুখোমুখি করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি আরও জানান, পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। খুনি জিয়া রক্তাক্ত হাতে খাবার খেতেন এবং খেতে খেতেই ফাঁসির আদেশে স্বাক্ষর করতেন।
গতকাল বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে সরকারি দলের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। যুক্তরাজ্য থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু আইনগত জটিলতা আছে। ওইসব জটিলতা আইনি প্রক্রিয়ায় নিরসন করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও তার প্রাপ্য সাজার মুখোমুখি করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ উদ্দেশ্যে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা ও আইনি কার্যক্রম একই সঙ্গে চলছে। যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করছে। দ্রুতই ফলাফল পাওয়া যাবে।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামিদের বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার লক্ষ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পাঁচজন পলাতক আসামি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, মেজর (অব.) নূর চৌধুরী, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন খান ও লে. কর্নেল (অব.) রাশেদ চৌধুরী এবং একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামি মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হারিছ চৌধুরী ও রাতুল আহম্মেদ বাবু ওরফে বাবু ওরফে রাতুল বাবুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা আছে। পলাতক আসামিরা যে দেশে অবস্থান করছেন, সে দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রচলিত কূটনীতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রী ও সিনিয়র কর্মকর্তা পর্যায়ে সার্বক্ষণিক কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশগুলোর সঙ্গে সরকারের যেকোনো পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে দেওয়ার ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যেই পলাতক খুনিদের অবস্থান সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তাদের অবস্থান খুঁজে বের করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আসাদুজ্জামান আসাদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, খুনি ফারুক-রশিদরা আগে নিজ থেকেই জাতির পিতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে, যেটা জিয়া জানতেন। অথচ জাতির পিতাই মেজর জিয়াকে ১৯৭২ সালে কর্নেল এবং ১৯৭৩ সালে ব্রিগেডিয়ার এবং একই বছরে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির চেয়ারে নিজেকে আজীবন আসীন করে রাখার বাসনা নিয়ে আইয়ুব খানের অনুকরণে সেনাছাউনিতে বসে দলছুট রাজনীতিবিদদের নিয়ে বিএনপি গঠন করেন। তিনি যেমন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন, তেমনি অবৈধভাবেই বিএনপি সৃষ্টি করেন।
তিনি আরও জানান, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানের হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করে একাধারে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন।
ইতিহাসের ঘৃণ্যতম হত্যাকা-ে জিয়ার সংশ্লিষ্টতা ছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা জানান, খুনি জিয়া তো রক্তাক্ত হাতেই খাবার খেতে বসতেন এবং খেতে খেতেই ফাঁসির আদেশে স্বাক্ষর করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত হন। জিয়া ইনডেমনিটি জারি করে জাতির পিতার খুনিদের রক্ষা করেন। তাদের বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করেন। ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর দালাল আইন বাতিল করে সাজাপ্রাপ্ত ১১ হাজার রাজাকার ও আলবদরকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেন। যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে এবং স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজ ও আলীমকে মন্ত্রী বানান। স্বাধীনতাবিরোধীদের ছেড়ে দিয়ে তাদের পুনর্বাসন ও মন্ত্রী বানানোর মধ্য দিয়ে জিয়া প্রমাণ করেন, তিনি পরাজিত শক্তির দালাল। জিয়ার সাড়ে ৫ বছরের শাসন আমলে ২১টি ক্যু ও পাল্টা-ক্যু হয়। অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল তাহেরকে তিনি ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগই স্বৈরাচারের হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে। ১৯৯১ সালে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। যে তার স্বামীকে অনুসরণ করে যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে উপহার দেয় লাখো শহীদের রক্তে ভেজা জাতীয় পতাকা। বঙ্গবন্ধুর খুনি রশিদ ও হুদাকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে এমপি বানিয়ে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তার আত্মার আত্মীয়তা।
তিনি আরও বলেন, ‘২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট দুঃসহ অত্যাচার-নির্যাতন চালায়, যা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্রতিহিংসার জঘন্য কালো অধ্যায় হিসেবে মানুষ মনে রাখবে। ২০০১ সালে কারচুপির নির্বাচনে জনগণের ভোট কেড়ে নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড এবং দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দমননীতির ফলে দেশের অবস্থা চরম বিপর্যস্ত ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল। বিএনপি জঙ্গিবাদে মদদ দিয়ে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, বাংলা ভাই ইত্যাদি সৃষ্টি করে দেশব্যাপী সন্ত্রাসী তা-বলীলা চালায়। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে। এতে আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ নেতাকর্মীকে হত্যা করে এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। অনেককেই পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়। শুধু আমার ওপরই ১৯ বার হত্যাচেষ্টায় হামলা করেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়া এবং সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার ও মমতাজউদ্দিনসহ ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল।’
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমানের প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা জানান, সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নকল্পে ফোর্সেস গোল-২০৩০-এর আলোকে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারতসহ সমরাস্ত্র শিল্পে উন্নত বিভিন্ন দেশ থেকে সমরাস্ত্র ক্রয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
