প্রায় ৪৮ বছর পর ভারতে লোকসভায় হলো স্পিকার নির্বাচন। গতকাল বুধবার বেলা ১১টা নাগাদ বিজেপির ওম বিড়লাকে স্পিকার করার জন্য লোকসভায় প্রস্তাব আনা হয়। তার বিরুদ্ধে কংগ্রেস সাংসদ সুরেশকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তবে পরে কণ্ঠভোটে ওম বিড়লাই ফের স্পিকার নির্বাচিত হন। এদিন বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। এর মধ্যে দিয়ে ১০ বছর পর বিরোধী দলনেতা পেল লোকসভা। গতকাল ভারতের লোকসভার প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে এত কিছুর মধ্যে ঘটে গেছে আরও নজির বিস্ময়কর কিছু ঘটনা। এদিন মোদির সঙ্গে করমর্দন করেন রাহুল গান্ধী। তবে স্পিকার নির্বাচনের পর লোকসভার কক্ষে শিষ্টাচারের যে ছবি ফুটে উঠেছিল, যেভাবে বিরোধীরা নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানান, তাতে মনে হচ্ছিল, শাসক দলের মনোভাবে কিছুটা হলেও বদল ঘটবে। কিন্তু সপ্তদশ লোকসভার মতো অষ্টাদশও যে অভিন্ন, সরকার যে সংঘাতের পথ ছাড়বে না, তা বোঝা গেল স্পিকারের আচরণে। অভিনন্দন পর্ব শেষ হওয়ার পর ওম বিড়লা ১৯৭৫ সালে জারি হওয়া জরুরি অবস্থার উল্লেখ করে এক দীর্ঘ বিবৃতি পাঠ করেন। তাতে কীভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকার হরণ করেছিলেন, দেশকে জেলখানা বানিয়ে দিয়েছিলেন, বাবাসাহেব আম্বেদকরের তৈরি সংবিধান পদে পদে লঙ্ঘন করেছিলেন, সেসব বিস্তারিত উল্লেখ করে তাকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দেন ও ওই সময়কে দেশের ইতিহাসের ‘কালো অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেন।
কংগ্রেসকে আক্রমণ করে স্পিকার বলেন, সে সময় তারা জোর করে বন্ধ্যত্ব করিয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা যাতে আদালতে যেতে না পারেন, তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সংবাদপত্রের ওপর জারি করা হয়েছিল যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা। আট মিনিটের দীর্ঘ বিবৃতি পাঠ শেষে জরুরি অবস্থা জারির বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের পর স্পিকার সেই সময় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দুই মিনিট নীরবতা পালনের ডাক দেন। তারপরেই সারা দিনের মতো মুলতবি করে দেন লোকসভা।
স্পিকার বিবৃতি পাঠ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধীরা তীব্র প্রতিবাদ করতে থাকেন। শুরু হয় স্লোগান। স্পিকার ও সরকারের মনোভাবের কড়া নিন্দা করে কংগ্রেসসহ বিরোধী সদস্যরা বলতে থাকেন, ৫০ বছর আগের ঘটনা টেনে এই সরকার তাদের অঘোষিত জরুরি অবস্থা চাপা দিতে চাইছে।
জরুরি অবস্থায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে নীরবতা পালনে সরকার পক্ষের সদস্যরা উঠে দাঁড়ালেও বিরোধীরা প্রতিবাদে মুখর থাকেন। ১৫ সেকেন্ড নীরবতা পালন করেই স্পিকার ওম বিড়লা সারা দিনের মতো অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, স্পিকারের এই বিবৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও মোদি সরকার তার আক্রমণাত্মক ভূমিকার বদল ঘটাবে না। সংসদ ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিরোধীদের পক্ষে তেমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা বৃথা।
সপ্তদশ লোকসভায় বিরোধীদের প্রতিবাদ টিভিতে দেখানো হতো না। এবারও হলো না। বিরোধীদের প্রতিবাদ না দেখিয়ে ক্যামেরা ধরে রাখল শুধুই স্পিকারকে।
রাহুল বিরোধী দল নেতা :
বিবিসি জানায়, লোকসভায় বিরোধী দলনেতা হওয়ার জন্য কোনো একক দলকে ৫৪৩ আসনের অন্তত ১০ শতাংশ পেতে হয়। কিন্তু আগের লোকসভা নির্বাচনগুলোয় বিরোধীদল কংগ্রেস বা অন্য কোনো দল তা পূরণ করতে পারেনি। ফলে ২০১৪ সাল থেকে লোকসভা বিরোধী দলনেতা শূন্য ছিল। এ বছরের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ৯৯টি আসন পাওয়ায় সেই শূন্যতা দূর করতে পেরেছে।
এবারের নির্বাচনে মোদির দল বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তাকে শরিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ওদিকে কংগ্রেস থেকে দলনেতা হয়ে শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ হিসেবে পার্লামেন্টে থাকছেন রাহুল। ফলে সবসময়ই সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবেন তিনি।
বিরোধীপক্ষের অবস্থান শক্ত হওয়ায় পার্লামেন্টে বিতর্কের সুযোগ থাকবে বেশি। ফলে সরকারের পক্ষে আলোচনা না করে কোনো বিল পাস করা কঠিন হবে।
আর রাহুলের জন্য তার নতুন এই পদ কেবল যে অনেক দায়িত্বপূর্ণ হবে তা নয়, তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ধৈর্য ধারণেরও পরিচয় দিতে হবে, যেমনটি গত ২০ বছরেও তাকে করতে হয়নি। ফলে বিরোধী দলনেতার পদ রাহুলের জন্যও হতে চলেছে এক বড় পরীক্ষা।
অবশ্য প্রথম দিনেই লোকসভায় রাহুল স্পিকারকে অভিনন্দিত করে নিরপেক্ষতা ও ইতিকর্তব্য মনে করিয়ে দেন। রাহুলের পাশাপাশি অন্য বিরোধী নেতারাও সবাই একে একে তাকে বুঝিয়ে দেন, প্রথম ইনিংসে তিনি যেভাবে সভা পরিচালনা করেছিলেন, তা বিরোধীদের হতাশ করেছিল। সভার মর্যাদাহানি হয়েছিল। গণতন্ত্রের প্রতি সুবিচার হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে সভার পরিচালক হিসেবে তার সাফল্যের কাহিনি বর্ণনা করেন। কীভাবে কভিডকালে তিনি সভা চালু রেখেছিলেন, অন্য সময়ের তুলনায় কীভাবে গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি বিল পাস করিয়েছেন, সেসব কথা প্রধানমন্ত্রী তাকে মনে করিয়ে দেন।
মোদির সেসব কথার রাশ টেনে রাহুল বলেন, এই সভা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। কত দক্ষতার সঙ্গে সভা পরিচালিত হচ্ছে, সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা দেশবাসীকে স্বরক্ষেপণ করতে দেওয়া হচ্ছে কি না। বিরোধী কণ্ঠ রোধ করে সভা চালানো দক্ষতার পরিচয় নয়।
কংগ্রেস নেতা বলেন, এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশবাসী বুঝিয়েছেন, তারা চায় বিরোধীরা দক্ষতার সঙ্গে সংসদে সংবিধান রক্ষা করুক। এ সভায় যাতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়, আমরা সেটা যেন করতে পারি, সেজন্য আপনার সঙ্গে সহযোগিতায় আমরা প্রস্তুত। শুধু চাই, আমাদের বলতে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আপনি সংবিধান রক্ষা করুন।
রাহুলের বেঁধে দেওয়া এই সুরেই একে একে কথা বলেন সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিএমকের টি আর বালু, এনসিপির (শরদ পাওয়ার) সুপ্রিয়া সুলে, শিবসেনার (উদ্ধব) নেতারা।
তবে বিজেপি বুঝিয়ে দিল, সংখ্যা কমলেও সরকার ও সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের চরিত্র ও মনোভাবের বিন্দুমাত্র বদল ঘটবে না। বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাতের পথেই তারা হাঁটবে।
