প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯২১ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রতিষ্ঠানটির। ব্রিটিশ শাসিত বাংলার পূর্বাংশে এটিই ছিল একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরাধীন দেশের পশ্চাৎপদ এ অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ব বাংলায় জ্ঞানের আলো ছড়ানোর পাশাপাশি শতবর্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন হলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন।
নানা অর্জন থাকলেও এ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আক্ষেপও রয়েছে। দেশের শীর্ষ এ বিদ্যাপীঠের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এখনো তা করতে পারেনি ঢাবি কর্তৃপক্ষ। আবাসন সমস্যা শতবর্ষী এ বিদ্যাপীঠের ‘অভিশাপ’ হয়েই রইল। ১৯টি আবাসিক হল ও ৩টি হোস্টেলে বর্তমানে আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে ১৫ হাজার ২৫৯ জনের। অথচ এখন নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৪; অর্থাৎ ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে। বাকি ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর তা নেই। শিক্ষকদের মানসম্পন্ন গবেষণা, আধুনিক লাইব্রেরি সুবিধা, শিক্ষার্থীদের খাবারের মান নিয়ে প্রশ্নসহ আরও আক্ষেপ রয়েছে। তবে শতবর্ষ পর হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়সূত্রে জানা গেছে, চলমান চতুর্থ ও আসন্ন পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের সময়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে বিশ্বমানের মানবসম্পদ তৈরির জন্য ৪০ হাজার শিক্ষার্থী, ২ হাজারের বেশি শিক্ষক এবং ৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর কথা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি) ও ভৌত অবকাঠামোগত মাস্টারপ্ল্যান (পিএমপি) নামে দুটি প্ররিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে ২০৪৫ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হবে। পাল্টে যাবে এর একাডেমিক ও ভৌতিক চিত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন ও মিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তাবিত এ দুটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একাডেমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই বিদ্যাপীঠ উচ্চতর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে, যা কার্নেগির শ্রেণিবিভাজন অনুযায়ী আর টু বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০৪৫ সালে এটি রূপান্তরিত হবে গবেষণা-প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা কার্নেগির বিভাজনে আর ওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়। একাডেমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা হবে। কিছু নতুন বিভাগও খোলা হবে।
জানা গেছে, ভৌত অবকাঠামোগত পরিকল্পনা পুরো বাস্তবায়িত হলে আধুনিক গবেষণাগারসহ একাডেমিক ফ্লোর স্পেস ২৭ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ বর্গফুট থেকে বেড়ে ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ বর্গফুট হবে। লাইব্রেরির সুবিধা ১ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৩ হাজার জন হবে এবং নারী শিক্ষার্থীর আবাসন-সুবিধা ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭০ শতাংশে উন্নীত হবে। মাস্টারপ্ল্যানে প্রদর্শিত ভবনগুলো বহুতলবিশিষ্ট হওয়ায় ভবনের ফুটপ্রিন্ট ২৭ থেকে ২২ শতাংশে কমে আসবে। ফলে সবুজ চত্বর ও উন্মুক্ত স্থান বাড়বে।
এ ছাড়া মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ওয়াকওয়ে ও সাইকেল-লেন নির্মাণ করে শিক্ষার্থীবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি ধারণ, সৌরশক্তি উৎপাদন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, গাড়ি পার্কিং সুবিধা, জলাধার সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন, বিদ্যমান খেলার মাঠের সংস্কার, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য খেলার মাঠ ও সুইমিং পুল করা হবে।
এ দুই পরিকল্পনার ফেইজ-১ সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এতে আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও আধুনিক লাইব্রেরি নির্মাণ ও উন্নত মানের গবেষণাগার স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল।
উপাচার্য বলেন, ‘১০০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানবিক, মৌলিক ও প্রায়োগিক শিক্ষার সমন্বয়ে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা বিস্তার করছে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৩৩ লাখ শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা দিয়েছে। বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারী এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক, দেশের সর্বপ্রাচীন এ বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় শতকে পদার্পণ করেছে। নতুন শতকের চাহিদা অনুযায়ী, এর রূপান্তর সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে একাডেমিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ও ফিজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান আমরা প্রণয়ন করেছি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত করা গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বশিক্ষা-মানচিত্রে অনন্যসাধারণ অবস্থানে পৌঁছাবে। আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মাণদ-ে প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থী প্রস্তুত করা।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৬০টি গবেষণা সেন্টার ও ব্যুরো রয়েছে। এ ছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭টি অঙ্গীভূত ও উপাদানকল্প কলেজের অধীনে শিক্ষাকার্যক্রম চলছে। উন্নয়ন বাজেটের সীমাবদ্ধতা, জনবলের ঘাটতি ও দক্ষতার অভাব এবং গবেষণা যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে এ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার মান রক্ষা করা একটি চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ, নান্দনিক অবকাঠামো ও দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস, পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক লাইব্রেরি সুবিধা, আইসিটি অবকাঠামো প্রভৃতি উচ্চশিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’
উপাচার্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার রূপকল্প ঘোষণা করেছেন। এ লক্ষ্য পূরণে অভীষ্ট মানবসম্পদের জোগান দিতে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। স্মার্ট ক্যাম্পাস, স্মার্ট ক্লাসরুম, লাইব্রেরির ব্যবস্থা করা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুরূহ; বিদেশি শিক্ষক, নিজস্ব উপার্জন, উন্নত প্রযুক্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত যথাযথ রাখাও দুরূহ, এসবের জন্য একটি ম্যানুয়াল প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও ভালো করা সম্ভব। মানসম্মত গবেষণার জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের বাজেট ও সমৃদ্ধ ল্যাব সুবিধা। এ ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সবার সম্মিলিত সহযোগিতা আশা করি। র্যাঙ্কিংয়ে আরও উন্নতি করার জন্যও একটি কমিটি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত গবেষণার প্রবণতা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। এই অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তথ্য ও প্রযুক্তি-জ্ঞানে সমৃদ্ধ তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপনের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছি “তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উচ্চশিক্ষা”।’
বর্ণাঢ্য কর্মসূচি, শিক্ষক সমিতির বর্জন : ১০৪তম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কর্মসূচি অনুযায়ী, ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শোভাযাত্রা করে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে জড়ো হবেন। সেখান থেকে উপাচার্যের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পায়রা চত্বরে যাবেন। সকাল ১০টায় পায়রা চত্বরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোর পতাকা উত্তোলন, পায়রা, বেলুন ও ফেস্টুন ওড়ানো, কেক কাটা এবং সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং ও উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশিত হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর সকাল সাড়ে ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ে আলোচনাসভা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। গতকাল রবিবার দুপুরে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি উপলক্ষে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দুঃখের বিষয়, এমন একটি দিনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজপথে থাকতে হবে। আমরা উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে জানিয়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কোনো কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি অংশ নেবে না। দাবি আদায় করে তবেই আমরা কেক কাটব।’
