মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে ভূমিকার জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সন্দেহাতীতভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন চৌধুরী মুঈন উদ্দিন। এক দশক আগে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি-বিডি) দণ্ডপ্রাপ্ত এই মানবতাবিরোধী অপরাধী ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতরের বিরুদ্ধে একটি মানহানির মামলা দায়ের করেছিলেন। সম্প্রতি সেই মামলায় তার পক্ষে রায় দিয়েছে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত। এই রায়কে ‘বিস্ময়কর ও হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ)।
সংস্থাটি গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই মামলার রায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে কিছু একতরফা ও অমূলক সমালোচনা এবং অমীমাংসিত আইনি দাবিকে ভিত্তি ধরে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত কিছু ‘অযাচিত’ মন্তব্য করেছে এবং সাম্প্রতিক রায়টি ‘ক্ষমতাবহির্ভূতভাবে’ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করে আইসিএসএফ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইসিটি-বিডির আইন, নিয়ম এবং বাংলাদেশে অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মুঈন উদ্দিনের বিচার পরিচালনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ও অনুধাবন ক্ষমতা—যা যুক্তরাজ্যের আদালতগুলো বর্তমানের এই মানহানির মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় আয়ত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাজ্যে মুঈন উদ্দিনের মামলাটি শুরু থেকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে আইসিএসএফ। ভিকটিমদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ১৯৭১ এর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় সহায়তাকারি সংগঠন হিসেবে আইসিএসএফ এর রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতা ও সংগঠনটির সম্মিলিত আইনি দক্ষতার নিরিখে আইসিএসএফ মনে করে—যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতের এই একতরফা সিদ্ধান্তটি মূলত পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্তিকর, এবং বাংলাদেশে পরিচালিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মুঈন-উদ্দিনের বিরুদ্ধে মূল মামলাটির আইন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্পর্কে স্পষ্টতই অনবহিত। অবিশ্বাস্য যে, যেসব সুস্পষ্ট ভুলের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্য সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেসব ভুল সনাক্তকরণ ও সংশোধন নিশ্চিত করতে এমনকী ন্যূনতম পর্যালোচনা ক্ষমতা প্রদর্শনেও উভয় পক্ষের আইনজীবী ও যুক্তরাজ্যের তিনটি স্তরের আদালতের বিচারকরা ব্যর্থ হয়েছেন।
বিশ্ব জুড়ে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য দায়ী হাজার হাজার ব্যক্তিকে আশ্রয় দেবার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের নিন্দনীয় ইতিহাস নিয়ে অতীতে যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গণহত্যা কনভেনশন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষরকারি দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য সুপ্রিমকোর্টের এই সিদ্ধান্ত গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রতিরোধ ও বিচার, এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষার প্রতি যুক্তরাজ্যের সদিচ্ছার অভাবকে নির্দেশ করে।
মুঈন উদ্দিনের কথিত মানবাধিকারের বিপরীতে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ভিকটিমদেরও ছিল ন্যায়বিচার লাভের অধিকার। অথচ, যুক্তরাজ্য সুপ্রিম কোর্টে ভিকটিমদের অধিকারের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। আইসিএসএফ মনে করে যুক্তরাজ্যের বিচারকদের সর্বোচ্চ ব্যর্থতা এটাই।
বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সম্পৃক্ততার অভাব শুরু থেকে লক্ষ্যণীয় ছিল, যা আইসিএসএফ অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে মনে করছে। কমনওয়েলথের সদস্য হিসেবে, প্রত্যর্পণ প্রচেষ্টাসহ কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সুযোগগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলে আইসিএসএফ মনে করে। ২০১৯ সালে যখন প্রথম যুক্তরাজ্যে মামলাটি উত্থাপিত হয়েছিল, তখন থেকেই কোনোপ্রকার পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবসহ, মুঈন-উদ্দিনের ওপর জারিকৃত ইন্টারপোলের রেড নোটিসটির ক্ষেত্রেও সরকারের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের গণহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সকল পক্ষের জন্যই বাংলাদেশ সরকারের এমন নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা খুবই হতাশাজনক। বস্তুত, ১৯৭১ সালের গণহত্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, এবং নিজ দেশের গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রাখা বাংলাদেশ সরকারেরই দায়িত্ব ছিল, কারণ আইসিটি-বিডি কর্তৃক প্রদত্ত রায়গুলো মূলত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর চূড়ান্ত বিচারিক নিরূপণ নির্দেশ করে।
এই রায় থেকে উদ্ভূত অন্যান্য উদ্বেগসমূহ
যুক্তরাজ্য সুপ্রিম কোর্টের উল্লেখিত রায়টি উদ্বেগজনক, কারণ এর মাধ্যমে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করার একটি ন্যাক্কারজনক নজির স্থাপিত হয়েছে। গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাবার অধিকার অস্বীকার করার পাশাপাশি, এধরণের রায় দণ্ডিত আসামীদের তাদের প্রতিষ্ঠিত দন্ডসমুহকে মানহানি মামলার ছদ্মবেশে পুনরায় তুলে ধরতে উৎসাহিত করবে। এছাড়াও, অন্য দেশের আইনী প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ১৯৭১ বিষয়ে যারা লেখেন এবং গবেষণা করেন তাদের উপর মানহানি মামলার ভীতিসঞ্চারের মাধ্যমে প্রকাশ্য সংলাপ রোধের পাশাপাশি মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর এক অমোঘ আঘাতের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এই রায়টি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ) আন্তর্জাতিক অপরাধের ভিকটিমদের পক্ষে কর্মরত বিশেষজ্ঞ এবং কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সংগঠিত জেনোসাইডের স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।
