ফের বন্যার কবলে সিলেট পানি বাড়ছে তিস্তাতে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৪, ০৬:০৩ এএম

ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে সিলেটে।  সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, গোয়াইন, ধলাইসহ সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া নেত্রকোনায় টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রধান নদী উব্ধাখালিতে পানি বেড়ে বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেছে। পানি বেড়ে চলেছে সোমেশ্বরী ও কংশের। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সিলেট : গতকাল সোমবার সিলেটে দিনভর প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই সঙ্গে সিলেটের উজানে অবস্থিত ভারতের চেরাপুঞ্জিতে হয়েছে অতিপ্রবল বৃষ্টিপাত। যে কারণে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিকেলে সুরমা নদীর পানি সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাটে বিপদসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সীমান্তবর্তী কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এই তিন উপজেলাসহ পুরো সিলেট জেলার নিম্নাঞ্চল আগে থেকেই প্লাবিত। এখন নতুন করে পানি বৃদ্ধিতে বন্যাকবলিতদের দুর্ভোগ-ভোগান্তি আরও বাড়বে। 

সিলেট জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত রবিবার পর্যন্ত জেলায় পানিবন্দি রয়েছে ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬ জন। ২১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে ১০ হাজার ৭১৩ জন। তবে সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজন নেই।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ৪৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সিলেটেও বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আবার পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাবে। সিলেটের নদ-নদীগুলোর পানি বেড়েছে।

নীলফামারী : পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তিস্তা নদীর পানি। এর আগে বিকেল ৩টায় বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার, দুপুর ১২টায় ৭ সেন্টিমিটার, সকাল ৯টায় ৫ সেন্টিমিটার এবং ভোর ৬টায় ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়। কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমা ধরা হয় ২৮ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার। অন্যদিকে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজে সন্ধ্যা ৬টায় পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫১ দশমিক ৬৭ সেন্টিমিটার (বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচে)। এর আগে দুপুর ১২টায় ৫১ দশমিক ৭২ সেন্টিমিটার, সকাল ৯টায় ৫১ দশমিক ৭৪ সেন্টিমিটার এবং ভোর ৬টায় ৫১ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার।

এদিকে পানি বাড়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকার ডুবে গেছে বাদামসহ বিভিন্ন ফসলি জমি। নদীতে পানি বাড়া-কমায় ভাঙনের মুখে পড়েছে বিভিন্ন এলাকা। এরই মধ্যে ভাঙনকবলিত পরিবারের অনেকে বসতঘর সরিয়ে নিয়েছেন। বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই ও পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের কয়েকশ বসতভিটা ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ডালিয়া পয়েন্টে ব্যারাজের পানি বাড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যারাজের সব গেট খুলে রাখা হয়েছে।

রংপুর : তিস্তা নদীর গঙ্গাচড়া এলাকার নিম্নাঞ্চল ও কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এরই কারণে এই উপজেলার তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে এবং ভাঙন ঝুঁকিতে অনেক পরিবার। বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেল ৩টা থেকে তিস্তা নদীর রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে এই কাউনিয়া পয়েন্টে দুপুর ১২টার দিকে বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার, সকাল ৯টায় ৫ সেন্টিমিটার এবং সকাল ৬টায় ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে।

তিস্তা নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তা নদীর নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপ চরের কিছু এলাকা এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে। নদীতে পানি বাড়া-কমার কারণে ভাঙনের মুখে পড়েছে এসব এলাকার মানুষ।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ তামান্না জানান, বর্ষার মৌসুমে তিস্তা নদীর পানি কিছু সময়ে বাড়ে আবার কমে যায়। যার কারণে তিস্তা নদী এলাকায় বন্যা ও ভাঙনের বিষয়ে আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। কোথাও কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

নেত্রকোনা : গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় উব্ধাখালি নদীর পানি কলমাকান্দা পয়েন্টে ৩৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে নদীটির পানি বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারোয়ার জাহান জানান, রবিবার সকাল ৯টায় উব্ধাখালির পানি কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছিল। কিন্তু রবিবার থেকে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় ওই নদীর পানি দ্রুত বেড়ে চলেছে। সোমেশ্বরী নদীর পানি বেড়ে বিজয়পুর পয়েন্টে ৫ দশমিক ১৯ মিলিমিটার নিচ দিয়ে ও একই নদীর দুর্গাপুর পয়েন্টে ১ দশমিক ৮০ মিলিমিটার নিচ দিয়ে বইছে। কংশের পানি বেড়ে জারিয়া পয়েন্টে ১ দশমিক ৬০ মিলিমিটার নিচ দিয়ে বইছে।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মো. শাহেদ পারভেজ জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। যেসব এলাকা বন্যাকবলিত হবে, সেই অঞ্চলে লোকজনের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ত্রাণের ব্যবস্থাও রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত