আর্জেন্টিনা কেন এখন ইসরায়েলের বন্ধু

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৪, ১২:১৮ এএম

ইসরায়েলের পক্ষে সবসময় সক্রিয় থাকে আর্জেন্টিনা। তাদের এ সম্পর্কের নেপথ্যে কী? এ বিষয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র মুক্তিকামী সংগঠন হামাস গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ভেতরে নজিরবিহীন হামলা চালায়। এর পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা উপত্যকায় নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে আসছে। দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় বিপর্যস্ত গাজা। ওই ভূখণ্ডে গত কয়েক দশকের চলমান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে। বিভিন্ন দেশ তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছে। তবে অনেকের আবেগের একটি দেশও ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বর্তমানে। ফুটবলের জন্য বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া দেশটি হলো আর্জেন্টিনা। কেন তারা ইসরায়েলকে এভাবে সমর্থন দিচ্ছে, বন্ধুর মতো থাকে তার একটি কারণ অনুসন্ধান করেছেন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী আর্জেন্টাইন সাংবাদিক জডর জালিত। এ বিষয়ে তার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে মিডল ইস্ট আই।

তিনি বলছেন, আর্জেন্টিনা সবসময় ইসরায়েলের পক্ষে ছিল না। সাধারণভাবে নিরপেক্ষ নীতি মেনে চলত তারা। এমনকি স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষেও তাদের অবস্থান ছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের কারণে ইসরায়েলপন্থি হয়ে পড়ে দেশটি। জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা বাণিজ্য, নতুন আর্জেন্টাইন সরকারের নীতিসহ বেশ কিছু কারণে এখন তারা ইসরায়েলে বন্ধু।

লাতিন আমেরিকা

গত বছরের অক্টোবরে হামাস যখন ইসরায়েলে ঢুকে হামলা করে, তখন আর্জেন্টিনার ভোটাররা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ড নিয়ে ব্যস্ত। দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তখন আচ্ছন্ন নির্বাচন নিয়ে। রাজনীতিবিদ এবং প্রার্থীরা তাদের চিন্তাভাবনা ভাগ করে নিচ্ছেন তখনকার টুইট বা বর্তমান এক্স-এ। এ সময়ে দেখা গেছে, দেশটির মধ্যবাম ধারার বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আলবার্তো ফার্নান্দেজ, তার উত্তরসূরি প্রার্থী সার্জিও মাসাসহ মধ্যডান প্যাট্রিসিয়া বুলরিচ, হুয়ান শিয়ারেটি এবং ডানপন্থি হাভিয়ের মাইলি ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর নিন্দা করছেন। যদিও তাদের কোনো পোস্টে সরাসরি গাজা, ফিলিস্তিন বা ফিলিস্তিনিদের উল্লেখ ছিল না। বামপন্থি প্রার্থী মারিয়াম ব্রেগম্যান অবশ্য নিরপরাধ প্রাণ হারানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ওই বছরের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি বিতর্কের দ্বিতীয় দফায় গাজায় সহিংসতার জন্য ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদকে দায়ী করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে দেখা গেছে, আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ছিল একচেটিয়া। পরে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হাভিয়ের মাইলি প্রশাসনকেও দেখা গেছে ইসরায়েলপন্থি বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করতে। যদিও শুরুতে মনে করা হচ্ছিল, আর্জেন্টিনায়ও ফিলিস্তিনপন্থি লাতিন আমেরিকান অন্যান্য দেশের মতো সরকার আসবে।

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের শুরুতে, আলজাজিরা লাতিন আমেরিকায় ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতির উদাহরণ হিসেবে দেশগুলোর সরকারি বিবৃতির সংগ্রহের প্রস্তাব দেয়। দ্য নিউ আরবের আরেকটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘লাতিন আমেরিকা কেন এত ফিলিস্তিনপন্থি?’ তারা বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে এ অঞ্চলের স্বাধীনতা অর্জন, বামপন্থি আন্দোলন এবং বিশাল সংখ্যায় আরব প্রবাসীদের বসবাস লাতিন আমেরিকাকে ফিলিস্তিনপন্থি করে তুলেছে। ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ ফার্নান্দো ব্র্যাঙ্কোলি বলছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ, প্রবাসীদের রাজনীতি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের প্রতি দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারিত হয়। তিনি বলছেন, বলিভিয়া যেমন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী, চিলির অবস্থান আবার জানিয়ে দেয় কীভাবে ‘বিদেশি সম্প্রদায়’ বৈদেশিক নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিরোধ রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তনকে ইঙ্গিত করে।

মতাদর্শ

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ ডি কির্চনার’র অধীনে ২০১০ সালে আর্জেন্টিনা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। তার মধ্য-বাম সরকার পেরোনিজমের তিনটি কেন্দ্রীয় নীতি পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করেছিল: সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই তার প্রশাসনের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। লাতিন আমেরিকায় বামপন্থি সরকারের উত্থান, গভীর আঞ্চলিক বোধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত স্বায়ত্তশাসনের কারণে আর্জেন্টিনা এমন অবস্থান নিতে পেরেছিল। তবে রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী এবং মার্কিনপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে লাতিন আমেরিকা জুড়ে ডানপন্থিদের উত্থান ঘটে। এরপর থেকে ব্রাজিলের জাইর বলসোনারো এবং আর্জেন্টিনার মাউরিসিও ম্যাক্রির মতো অনেক নতুন রাষ্ট্রপতি ইসরায়েলকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেন। যা লাতিন আমেরিকা-ইসরায়েল সম্পর্কের মতাদর্শগত সখ্যের ভিত্তিতেই ঘটে। আর্জেন্টিনার নতুন প্রেসিডেন্ট মাইলি এসব সরকারের সঙ্গেই খাপ খান। মাইলি বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলি পতাকা ওড়ান এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি বিতর্কের সময় অন্যান্য ডানপন্থি শাসনকে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার আহ্বান জানান।

একরোখা মাইলি

আর্জেন্টিনার নতুন সরকারকে বলা হচ্ছে গোঁড়া এবং একরোখা। যার বৈদেশিক নীতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। অন্যান্য উগ্র ডানপন্থি সরকারের মতোই তাদের আচরণ। মাইলির ব্যক্তিগত মতাদর্শই ইসরায়েলের দিকে আর্জেন্টিনাকে চালিত করছে। আর্জেন্টিনার সমাজবিজ্ঞানী জুয়ান গ্যাব্রিয়েল টোকাটলিয়ান যাকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দেশটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অরনেলা ফাবানিও প্রশ্ন তোলেন যে, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের প্রতি আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যগত যে নিরপেক্ষতা তার দিন শেষ কি না।

মাইলি নিজেই বলেছিলেন, আমি ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা ভাবছি এবং আমি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম ইহুদি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করছি। ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও ইহুদি ধর্মের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা তিনি বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ এবং মিডিয়ায় বিবৃতির মাধ্যমে জানান দিয়েছিলেন। যদিও তিনি ক্যাথলিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী বলে দাবি করেন, অথচ চার্চের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভালো নয়। তিনি প্রায়ই পোপ ফ্রান্সিসের সমালোচনা করেন, যাকে তিনি বলে থাকেন ‘কমিউনিজমের প্রচারক’ হিসেবে।

মাইলি এমনকি তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্যও ইসরায়েলকে বেছে নেন। জেরুজালেমে দেশের দূতাবাস স্থানান্তর নিশ্চিত করেন। ইরান ড্রোন হামলা চালানোর পর ইসরায়েলের প্রতি ‘অটল সমর্থন’ প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের পূর্ণ জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে আর্জেন্টিনার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি এক বৈঠকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মাইলিকে ‘ইহুদি রাষ্ট্রের মহান বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন।

 ২০২১ সালে লা নাসিওনের সঙ্গে এক কথোপকথনে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমি ইহুদি নই, কিন্তু আমি ইসরায়েলের একজন ভক্ত, আমার গভীর প্রশংসা আছে তাদের বিষয়ে। আমি ক্যাথলিক এবং প্রতিদিন আমি একজনের সামনে হাঁটু গেড়ে থাকি।’ আবার একই সময়ে এক্স-এ তিনি লেখেন, আমি ক্যাথলিক, কিন্তু এর মানে এ নয় যে আমি ইহুদি জনগণ এবং তাদের শিক্ষার একজন মহান ভক্ত নই। তিনি বারবার ইসরায়েলকে তার ‘প্রধান মিত্র’ করার এবং রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হলে আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি এমনও বলেছিলেন যে, তিনি নির্বাচিত হলে, তার প্রথম আন্তর্জাতিক সফর হবে ইসরায়েলে। যা বাস্তবায়ন করেও দেখিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, আমার সবচেয়ে বড় রেফারেন্স, যাকে আমি ক্রমাগত উল্লেখ করি, তিনি হলেন মুসা। তিনি নিজেকে ‘আর্জেন্টিনার রাজনীতির মোজেস’র মতো অনুভব করেন কি না জানতে চাইলে উত্তর দিয়েছিলেন, আপনি কখনো সেই অবস্থানে থাকতে পারবেন না, একজন নবী যিনি স্রষ্টার সঙ্গে কথা বলেছেন। এ ছাড়া মৌলিক বৈশিষ্ট্য মুসার অসীম নম্রতা, আমি নম্র নই। এটি অবিরাম যুদ্ধ যা আপনাকে অহং, লোভ এবং লালসার বিরুদ্ধে বিজয়ী করবে।

নিরাপত্তা সহযোগিতা

বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েল থেকে আর্জেন্টিনায় সামরিক অস্ত্র, নজরদারি সরঞ্জাম এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের যন্ত্রপাতি লাতিন আমেরিকায় প্রবেশ করেছে। ১৯৭৮ সালের আগস্টে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানায়, ‘দেড় মাসের মধ্যে, তিনজন ইসরায়েলি জেনারেল (সংরক্ষিত) আর্জেন্টিনা সফর করেছিলেন’। আর্জেন্টিনা এবং ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতা বিষয়ে গবেষক বিশারা বাহবাহ এবং লিন্ডা বাটলার লেখেন, ‘১৯৮১ সাল নাগাদ, আর্জেন্টিনা ইসরায়েল থেকে তার অস্ত্রের ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কিনছিল। ইসরায়েল আর্জেন্টিনার কর্র্তৃত্ববাদী সরকারকে অস্ত্র দিয়েছিল যাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আর্জেন্টিনার সরকার ইসরায়েল থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনে। ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে ইরান, হিজবুল্লাহ আর্জেন্টিনার শত্রু হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে তাদের দেশে হামলাও হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে এ দুদেশের সামরিক সম্পর্কে ভাটা পড়ে। তবে সে সম্পর্ক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ওঠানামা করে। জডর জালিত আরেকটি কারণ বলেছেন, প্রবাসীদের প্রভাব। আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের রাজনীতি, বিশেষ করে ইহুদি সম্প্রদায় বা ইসরায়েলপন্থিদের প্রভাব রয়েছে। তারা আর্জেন্টিনার বৈদেশিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের অবস্থান ছিল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে। এমনকি ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করার ভোট থেকেও বিরত ছিল আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনায় ইহুদিদের উপস্থিতি কম থাকলেও মাইলি যেহেতু ইহুদিপ্রেমী, তিনি তার পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছেন সেভাবে। যার ফলে আর্জেন্টিনা এখন নিরপেক্ষ নীতি ত্যাগ করে একচেটিয়া ইসরায়েলের বন্ধু হয়ে উঠেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত