ইমামদের ওপর আক্রমণ কী বার্তা দেয়?

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪, ০৪:১৭ এএম

ইমাম মুসলিম সমাজের প্রধান ব্যক্তিত্ব। ধর্মীয় জ্ঞান ও তত্ত্বে সবার শীর্ষে অবস্থিত। ধর্মীয় কাজে সবার চেয়ে অগ্রস্থিত। অল্পে তুষ্ট, শুদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও নিষ্কলুষ জীবনযাপনের অনুপম দৃষ্টান্ত। হৃদ্যতা, সৌহার্দ ও উদারতায় অতুলনীয়। আমাদের সমাজের প্রত্যেক ইমাম এমন গুণে গুণান্বিত এবং মানিত ব্যক্তি হিসেবে অগ্রগণ্য।

ইমাম দুনিয়াতে মানিত হিসেবে অগ্রগণ্য হয় কী কারণে? কারণ খুবই সহজ। তা হলো, দৈনিক পাঁচবার ফরজ নামাজে একদল অনুসারী নিয়ে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো, তার ইবাদতে মনোনিবেশ করা, যেখানে ইমামের অবস্থান থাকে সবার সামনে। আর অনুসারীরা থাকে ইমামের পেছনে। এই যে আল্লাহর সম্মুখে ইমাম সবার অগ্রে দাঁড়ানো এবং সব অনুসারীর কাজটা ইমাম করে দিচ্ছেন অর্থাৎ ইমামের সুরা-কেরাতই মুক্তাদির সুরা-কেরাত। সুতরাং যিনি সরাসরি আল্লাহর সম্মুখে সবার অগ্রে অবস্থান করেন, দুনিয়াতে আর কে বা কারা আছে যে, তাদের কাছে ইমাম অগ্রগণ্য হবেন না?

দুনিয়াতে ইমামরা যেমন সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে অন্য সবার চেয়ে অগ্রগণ্য, পরকালেও তেমন অবস্থানে থাকবেন তারা। পরকালে যখন সবার আমলের হিসাব নেওয়া হবে, সবাই যখন ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি বলবে, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ইমামরা মিশকের স্তূপের ওপর আরামে অবস্থান করবেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তি কেয়ামতের দিন মিশকের কস্তুরির স্তূপের ওপর থাকবে। এক. যে ক্রীতদাস আল্লাহ ও তার প্রভুর হক ঠিকমতো আদায় করে। দুই. যে ব্যক্তি কোনো কওমের ইমামতি করে আর তারা তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। তিন. যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রত্যেক দিন ও রাতে আজান দেয়।’ (তিরমিজি) ইমাম নামাজের ইমামতি ছাড়াও মুসলিম সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদন করেন।

আমাদের দেশে বর্তমানে ইমামরা যে ধর্মীয় সেবা দিচ্ছেন তার কোনো বিকল্প নেই। যদিও মাস শেষে যথাযথ সম্মানজনক একটা সম্মানী দেশের অধিকাংশ ইমামের বরাদ্দে থাকে না। তবুও তারা অল্পে তুষ্ট থাকেন। পেশার চেয়ে বরং দায়িত্ববোধকেই প্রাধান্য দেন। আমাদের এ দেশ ভয়ংকর রকমের দুর্নীতিগ্রস্ত একটি দেশ। কারণ দেশের ভয়ংকর সংখ্যক মানুষ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভালো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এ দেশে যদি ভালো মানুষের তালিকা করা হয়, নিঃসন্দেহে দেশের ইমামরা এ তালিকার শীর্ষে থাকবেন, যদি তালিকাটি স্বচ্ছ হয়।

অত্যন্ত দুঃখের একটি বিষয় হচ্ছে, এ দেশের কিছু মানুষ ক্রমেই এতটা উগ্র হয়ে উঠছে যে, তারা আমাদের নিরীহ ইমামদের ওপরও হামলা করছে অহরহ। সম্প্রতি দেশের কয়েক জায়গায় ইমামরা ভয়ংকর হামলার শিকার হয়েছেন। গত মঙ্গলবার (২ জুলাই) নামাজরত অবস্থায় মসজিদের ইমামের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে ইমামের পাজরের দুপাশে মারাত্মক জখম হয়। ওই ইমামের নাম হাফেজ মাওলানা বদরুল হাসান। তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের সাতচর উত্তরপাড়া জামে মসজিদের ইমাম। মঙ্গলবার মাগরিবের জামাত শেষে ইমাম বদরুল হাসান সুন্নত নামাজ পড়ছিলেন। এ সময় সজীব নামে এক মুসল্লি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ইমামের শরীরের পেছনে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। এতে রক্তাক্ত অবস্থায় ইমাম মসজিদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

গত জুন মাসে নীলফামারীর সৈয়দপুরে হাজারীহাট মসজিদের ইমাম মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন। এতে এলাকাবাসীসহ উলামায়ে কেরাম প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ হামলার পর স্থানীয় থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে খুব দ্রুত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হবে। গত এপ্রিল মাসে রাজবাড়ী সদর উপজেলার রাজাপুর পূর্বপাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম ইমরান হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে স্থানীয় একজন যুবক। শুক্রবার আসর নামাজের পর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইমাম ইমরান হোসেন মসজিদ সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় রাকিব নামে স্থানীয় এক যুবক ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশে ইমামের মাথা লক্ষ করে কোপ দেয়। এতে ইমামের মাথার কিছু অংশ ও কানের অংশ বিশেষ কেটে যায়। চলতি বছর মার্চে ময়মনসিংহের গোহাইল কান্দি পশ্চিম পাড়া বাইতুল আমান জামে মসজিদের ইমাম মুফতি আব্দুল খালেক অতর্কিত হামলার শিকার হন। ফজরের নামাজ পড়াতে যাওয়ার সময় বাসা থেকে বাহির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক মহিলা তার ওপর হামলা করে। ইমামের বাসার পেছনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মহিলা। ইমাম বের হওয়ার পর প্রথমে চোখে বালু ছুরে মারে। তারপর হাতুড়ি দিয়ে মাথা ও চোখে আগাত করে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

গত বছর জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের হাতকুড়া গ্রামের বাইতুল আমান জামে মসজিদের ইমাম মুফতি সাইফুল ইসলাম ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হন। এতে তার চোখ, মাথা এবং শারীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়ে গুরুতরভাবে আহত হন। এ বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। বরং ইমামের ওপর হামলার পর সেই দুর্বৃত্তরাই তাকে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়। এরপর থানায় মামলা করা হয়। মামলার পর ১৫ দিনেও আসামিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। তখন আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে তওহিদি জনতা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে।

ইমাম আমাদের সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। হজরত রাসুল (সা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম ইমাম। তার পর খোলাফায়ে রাশিদ্বীন ইমামতি করেছেন। যদিও তৎকালীন রাষ্ট্রের প্রধানরাই ইমামতির এ মহান দায়িত্ব পালন করতেন, এখন সে চিত্র বদলেছে। তবুও ইমামমির মতো যে মহান দায়িত্ব রাসুল (সা.) এবং তার প্রধান চার খলিফা পালন করেছেন সেই একই দায়িত্ব পালন করছেন আমাদের ইমামরা। সুতরাং ইমামদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ও আক্রমণাত্মক আচরণ দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর ইমামদেরও আরেকটু সতর্ক থাকা এবং নিজ দায়িত্বের প্রতি সচেতন হওয়া কাম্য।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত