পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। সুযোগ ছিল গবেষণা বা উন্নয়ন সংস্থায় ক্যারিয়ার গড়ার। কিন্তু সেদিকে না ছুটে ক্যারিয়ার গড়েন দাবাতেই। এমনকি স্ত্রী ২২তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকার বাইরে নিয়োগ হওয়ায় স্বামীর দাবার ক্যারিয়ারে ব্যাঘাত ঘটবে বলে আর যোগদান করেননি। তাই নৃবিজ্ঞানী না হয়ে জিয়াউর রহমান বনে যান বাংলাদেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার। যিনি একজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন দাবায়। জীবনের শেষ চালটাও ওই দাবার বোর্ডেই। দাবা খেলতে খেলতেই কাল শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।
দাবা ফেডারেশনের টুর্নামেন্ট কক্ষে জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম রাউন্ডে আরেক গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীবের বিপক্ষে খেলছিলেন জিয়া। ঠিক তখনই মাথা ঘুরে পড়েন যান। দ্রুতই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। মাত্র ৫০ বছর বয়সেই থেমে গেল তার জীবনের চাকা।
দেশের দ্বিতীয় এই গ্র্যান্ডমাস্টার বেড়েই উঠেছেন দাবাড়ু পরিবারে। তার বাবা পয়গাম উদ্দিন আহমেদও দাবাড়ু ছিলেন। ১৯৮৪ সালে জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। বাবাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে দাবাড়ু হয়েছিলেন জিয়া। পরে তার ছেলে তাহসিন তাজওয়ার জিয়াও ধরেছেন বাবা-দাদার পথ। একই পরিবারে তিন প্রজন্মের (দাদা-বাবা-ছেলে) জাতীয় দাবায় অংশগ্রহণের রেকর্ড বাংলাদেশে অন্য কারও নেই। এমনকি জিয়ার স্ত্রী তাসমিন সুলতানা লাবণ্যও ২০১০ সালে জাতীয় মহিলা দাবার বাছাইয়ে অংশ নিয়েছিলেন।
অথচ ২০০২ সালে স্ত্রী লাবণ্য ২২তম বিসিএসে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৪তম ও নারীদের মধ্যে ২য় হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক এই ছাত্রী যোগ দেননি ঢাকায় পোস্টিং না হওয়ার কারণে। প্রথম পোস্টিং ঢাকায় হলে তাসমিনের ক্যারিয়ারও ভিন্ন হতে পারত। ২২তম বিসিএসের অনেকেই এখন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। তবে এ নিয়ে আক্ষেপ শোনা যায়নি তার কণ্ঠে; বরং পরিবারের কাছে থাকতে পেরেই তৃপ্ত ছিলেন তিনি।
দাবার কোনো প্রতিযোগিতায় জিয়ার খেলা মানেই কক্ষের বাইরে লাবণ্য আর তাহসিনের উপস্থিতি ছিল সাধারণ দৃশ্য। তারা কাছে থাকলে নাকি জিয়া বাড়তি উৎসাহ পেতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পরিবারই আমার অনুপ্রেরণা এ জন্য ওদের সব সময় কাছে রাখি। শুধু দেশে নয়, বিদেশের সফরগুলোতেও ওদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।’
ক্যারিয়ারে জিয়ার যত উত্থান, সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে ফেলার পরে। ১৯৭৪ সালের ১ মে জন্ম নেওয়া জিয়া ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই দাবায় জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র থাকাকালেই ১৯৯২ সালে হয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মাস্টার। ওই সময় বেশ কয়েকবার জিএম নর্ম মিস করেছেন। পড়াশোনার চাপ থাকায় তাই পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেননি। কিন্তু স্নাতকোত্তর শেষ করেই নিজেকে স্বাধীন অনুভব করেন জিয়া। ১৯৯৮ সালে পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্ত হয়ে লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন তিন বছরের মধ্যে জিএম হবেন। আড়াই বছরেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলেন তিনি।
২০০২ সালে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর জীবনের লক্ষ্যপথ শুধুই দাবা বেছে নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগেই পড়েছেন আরেক গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তার। তিনি অবশ্য গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাতেই নিজের পরবর্তী ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছেন। মাঝে কম্বোডিয়ার কান্ট্রি ডিরেক্টরের মতো পদেও ছিলেন। সেই একই পথ বেছে নিতে পারতেন জিয়াও। কিন্তু তিনি সেটা না করে দাবাকেই ভালোবেসে গেলেন। শুধু ক্যারিয়ারই গড়েননি। এটা ছিল তার আরেকটি পরিবার।
বাংলাদেশ প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছিল ১৯৮৯ সালে নিয়াজ মোর্শেদকে। তারপর থেকে এক যুগ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। যে আঁধার দূর করে আলো জ্বালিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। ২০০২ সালে দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হন। তারপর একে একে রিফাত বিন সাত্তার, আব্দুল্লাহ আল রাকিব, এনামুল হোসেন রাজীব এসেছেন ২০০৯ সাল পর্যন্ত। আর এই সময়কাল দেশের দাবার স্বর্ণ যুগ। তারপরের এক যুগ অনেকটা অন্ধকারাচ্ছন্নই। বিমান বাংলাদেশ দাবা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর টুর্নামেন্টের সংখ্যা হ্রাস পায়। কমে বাইরে খেলা। সঙ্গে সংগঠকদের অদক্ষতা-অন্তর্কোন্দল, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ নানা কারণে গত এক যুগে দাবার মান উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। এতে স্পষ্টত প্রভাব পড়েছে গ্র্যান্ডমাস্টারদের ওপর। জিয়াও তাই সুপার গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারেননি।
এত কিছুর পরও দাবাকে ছাড়েননি জিয়া। যেখানে ছিল না তারকাখ্যাতি পাওয়ার সুযোগ, ছিল না অর্থের ঝনঝনানি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানও তাদের পণ্যদূত করার জন্য বিশেষ আগ্রহ দেখাত না। যে জীবন বেছে নিলে পথ অনেক বন্ধুর, সেটা ছিল জানা কথা। তবুও জিয়া ভালোবেসে গেলেন দাবাকে। ক্যারিয়ারও গড়লেন এই খেলাকে ঘিরেই। দাবা ছাড়া যে আর কিছু বুঝতেনও না তিনি। তাই জীবনের শেষনিঃশ্বাসটাও ত্যাগ করলেন দাবার বোর্ডেই।
