উজানের ঢল আর কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এতে উত্তরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দফায় দফায় বন্যায় খাদ্য, সুপেয় পানিসহ নানা সংকটে ভুগছে বন্যাকবলিত মানুষ। অনেক এলাকায় স্কুল-কলেজে পানি উঠে বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষা কার্যক্রম। সড়ক তলিয়ে ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা। তবে সিলেট অঞ্চলে পানি কমে জকিগঞ্জ উপজেলা ছাড়া বাকিগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
সবমিলিয়ে দেশের ১০টি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ১২ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। গতকাল শুক্রবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে।
সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আভাস দিয়েছে পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। গতকাল সকালে কেন্দ্রের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যার পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে। তবে এ সময়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বেড়ে চারটি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল পানি বেড়ে বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ৮৬টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনে পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। এতে বিশুদ্ধ পানি, শিশু ও গো-খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারদের কোনো খোঁজ নেই। তাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ বানভাসীদের।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কর্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ইসলামপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন, বকশীগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও মাদারগঞ্জ উপজেলার দুটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে ২২ হাজার ৬৫টি পরিবারের ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৯০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলায় ১১টি আশ্রয়কেন্দ্রে গবাদি পশু নিয়ে ১ হাজার ৮০১ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
রাস্তাঘাটে পানি ওঠায় উপজেলা শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে পানি প্রবেশ করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইসলামপুরের চিনাডুলি ইউনিয়নের পশ্চিম বলিয়াদহ নুরুল হুদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিবারের চার সদস্য নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন খট্টু ম-ল (৬২)। তিনি বলেন, ‘তিন দিন আগে বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। গতকাল গোয়াল ঘরে পানি ওঠছে। গরু, ছাগল গোয়াল ঘরে রাখতে পারছি না। এখানে নিয়ে আসছি। ঘরের মাটি ভেঙে যাচ্ছে। ঘরে পানি থাাকায় রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা কোনো খোঁজখবর নেন না। কোনোরকম সহযোগিতা করে নাই।’
টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে টাঙ্গাইলের সব নদীর পানি বেড়ে চার উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জেলার যমুনা ও ঝিনাই নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ২০ ও ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভূঞাপুর, গোপালপুর, কালিহাতী ও সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া ভূঞাপুর, কালিহাতী ও সদর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙনে ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। লোকালয়ে পানি ওঠায় সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন। একই সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে সাপের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে বেশি আতঙ্ক রয়েছে।
জেলার পাঁচটি বাজারে পানি ওঠায় ব্যবসায়ীরা বেকায়দায় পড়েছেন। কালিহাতী উপজেলার দুর্গাপুর-বেরীপটল সড়কের কুবুদ্ধির মোড় এলাকায় পাকা সড়ক ভেঙে পানি ঢুকছে। দুর্গাপুরের রামদেবপুর উত্তরপাড়া হালিম মন্ডলের বাড়ি থেকে দক্ষিণপাড়া সোলেমান সিকদারের বাড়ি পর্যন্ত কাঁচা সড়কের চার স্থানে ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। সদর উপজেলার কাকুয়া, কাতুলী ও মাহমুদনগর এলাকায় যমুনা নদীর পানি ঢুকে পড়েছে।
টাঙ্গাইল পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে যমুনা, ঝিনাই, ধলেশ্বরীসহ জেলার সবকটি নদীর পানি বেড়েছে। আরও কয়েক দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। নদীভাঙন এলাকায় আপদকালীন (জরুরি) পরিষেবা হিসেবে জিওব্যাগ ডাম্পিং করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মো. কায়ছারুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রমাগত পানি বৃদ্ধি পেলে আরও বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হতে পারে। বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে।’
কুড়িগ্রামেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা এবং গ্রামের পর গ্রাম। প্লাবিত হয়েছে নদ-নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ৪১ ইউনিয়নের দুইশর বেশি গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রাম পাউবো জানায়, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৭২ সেন্টিমিটার ও হাতিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছে মানুষজন। বানভাসি পরিবারগুলো বসতবাড়িতে বাঁশের মাচান, নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অধিকাংশ পরিবারে পাঁচ দিন ধরে চুলা জ¦লছে না। চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। বানভাসিদের অনেকেই গবাদি পশুসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের কাঁচা-পাকা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বানভাষীদের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।
সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের মিলপাড়া এলাকার আব্দুল মতিন বলেন, ‘পানি হু-হু করে বাড়ছে। ঘরেও পানি প্রবেশ করেছে। চিন্তা-ভাবনা করছি উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার।’
সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের অনেক চর ও দ্বীপ চর তলিয়ে গেছে।
অনেক কষ্টে বসবাস করছে চরের মানুষ। এ ছাড়াও কুড়িগ্রাম-যাত্রাপুর সড়কের দুটি স্থানে পানি ওঠায় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।’
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি আরও ৪৮ ঘণ্টা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি
