পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের দেড়শ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ১২৬ একর জমির উধাও হওয়ার ঘটনায় রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার তাদের ঠিকানায় তলবি নোটিস পাঠানো হয়। তাদের ১১ জুলাই দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের জন্য গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ৬২১৩ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু রাজউক টাকা পরিশোধ করেও ১২৬ দশমিক ১৯৫ একর জমি বুঝে পায়নি, যার জন্য তাদের ১১ কোটি ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৫৯ টাকা দিতে হয়েছে। দুদক অভিযোগটি পাওয়ার পর অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। দুদকের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলমকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি রাজউকের দুজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দেন। যাদের তলব করা হয় তারা হলেন রাজউকের প্রকল্প ব্যবস্থাপক-৩ মো. আশরাফুল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মেহেদী হাসান রওনক। এ বিষয়ে জানতে রাজউকের প্রকল্প ব্যবস্থাপক-৩ মো. আশরাফুল ইসলামকে ফোন দেওয়া হলে তিনি ফোনকল কেটে দেন।
দুদকের তথ্যমতে, অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে এ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র চেয়ে গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তরে চিঠি পাঠান দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা। অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ, মৌজার নাম, শ্রেণি, অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দকৃত টাকার পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়। বরাদ্দকৃত জমি অধিগ্রহণে প্রদত্ত টাকার পরিমাণও জানতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া অধিগ্রহণের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, পদবি, পিতা-মাতার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। রাজউক পূর্বাচল প্রকল্পের ডিপিপি, প্রকল্পের অগ্রগতি-প্রতিবেদন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের রাজউকের অডিট প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি ও অডিট অধিদপ্তরের ১২৬ একর জমি গায়েবসংক্রান্ত প্রতিবেদনের কপি ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দুদকে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প ১৯৯৫ সালে হাতে নেওয়া হয়। ২০০৩ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ৬২১৩ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং অধিগ্রহণ বাবদ ৫৪২ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়।
বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অফিস ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত রাজউকের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর যে অডিট পরিচালনা করে তাতে জমি উধাও হওয়ার ঘটনা জানা যায়। অডিট রিপোর্টে বলা হয়, পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য মোট ৬২১৩ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এ জমি বাবদ অধিগ্রহণমূল্য পরিশোধ করা হয় ৫৪২ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। পরে রাজউকের এ জমি আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক, বন ও ইকোপার্ক, খেলার মাঠ, ওয়াটার বডিসহ মোট ২০টি ক্যাটাগরিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে রাজউক ৬০৮৭ দশমিক ৩৫৫ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে। অবশিষ্ট ১২৬ দশমিক ১৯৫ একর জমি বুঝে পায়নি। এ পরিমাণ জমি অধিগ্রহণে রাজউকের খরচ হয়েছে ১১ কোটি ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৫৯ টাকা।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির ২০৩৩ দশমিক ৫৫ একর আবাসিক প্লটের জন্য, ৩২৫ দশমিক ৩৬৫ একর আবাসিক ব্লকের জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ২৭০ দশমিক ৩৯৬ একর, রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জন্য ৭১ দশমিক ৪১৩, হাসপাতালের জন্য ২৮ দশমিক ২৯, কমিউনিটি অর্গানাইজেশনের জন্য ২৯ দশমিক ৭৩, খেলার মাঠের ৬৮ দশমিক ১৪৯, আরবান গ্রিনারির জন্য ১৩৯ দশমিক ৪৭৮, বন ও ইকোপার্কের জন্য ২২৮ দশমিক ৫২৩, স্পোর্টস ফ্যাসিলিটির জন্য ৯৯ দশমিক ৮৩২, বাণিজ্যিক বরাদ্দের জন্য ২১৪ দশমিক ৮৪১, ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের জন্য ১৩২ দশমিক ৭১১, সোশ্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের জন্য ৭৬ দশমিক ৯২৭, আরবান ইউটিলিটি ফ্যাসিলিটির জন্য ৪৩ দশমিক ৩৪৬, বাংলাদেশ পুলিশের জন্য ৩০ দশমিক ৭৫৮, শিল্পপার্কের জন্য ৬৬ দশমিক ৩০৫, পথচারীদের পথের জন্য ১৪৫৪ দশমিক ২৫৪ এবং ওয়াটার বডির জন্য ৪৬০ দশমিক ৯৪০ একর মোট ৬০৮৭ দশমিক ৩৫৫ একর। বাকি ১২৬ দশমিক ১৯৫ একর জমির হদিস নেই।
অডিট প্রতিবেদনের আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর সচিবের দপ্তরে প্রতিবেদনসহ চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির জবাব না পেয়ে ২০২১ সালের ১৮ মার্চ তাগিদপত্র পাঠানো হয়। তারপরও জবাব পায়নি অডিট অফিস। এরপরই প্রতিবেদন ২০২২ সালের ২ জুন সংসদীয় কমিটি ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিগ্রহণ করা জমি থেকে কম জমি দখলে নেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অদখলকৃত জমি চিহ্নিত করে দখলে নেওয়া ও যারা এ কাজে সংশ্লিষ্ট তাদের চিহ্নিত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখার একজন সহকারী পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজউকের জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক কোটার জন্য আলাদা আলাদা বরাদ্দমূল্য (বেজ) নির্ধারণ করা আছে। আবাসিক প্লটের প্রতি কাঠার বেজমূল্য ২ লাখ আর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতি কাঠার মূল্য ১০ লাখ টাকা। যে ১২৬ একর জমি পাওয়া যায়নি, তা শুধু আবাসিক বরাদ্দমূল্য ধরে হিসাব করলে ১৫১ কোটি ৪২ লাখ টাকা রাজউকের তহবিলে জমা হতো। আর বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের বরাদ্দমূল্য ধরলে আরও বেশি টাকা জমা হতো।
তিনি বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পে আবাসিক প্রকল্পে প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। রাজউকের যে ১২৬ একর জমি পাওয়া যায়নি, আবাসিক প্লটের হিসাবে ধরলে তার বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়াবে ৫ হাজার ২৯৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
