রথের ১০০ স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন উদাসীন!

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৪, ০৬:৩৩ এএম

বগুড়ায় রথযাত্রায় অংশ নিতে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের ভূঁইয়াগাতি থেকে আসেন মোহনা (২৮)। রথের পাশেই ছিলেন তিনি। বৈদ্যুতিক শকে আহত হয়ে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। তার বাবা সুভাষ চন্দ্র বলেন, ‘মেয়ে আমার পুণ্য নিতে এসে মরণের পথে রয়েছে। পুণ্যের বদলে এ কোন ঘটনার সাক্ষী হলো মেয়ে।’ এ সময় মোহনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। একই সঙ্গে আহত হয়েছেন বগুড়া শহরের চেলোপাড়া এলাকার পূরবী (৫০)। তিনি বলেন, ‘রথের সঙ্গে অনেক হাত দিয়েছিল। আমরা একে অপরের গায়ে হাত দিয়েছিলাম। রথ যাচ্ছিল, হঠাৎ আমরা ছিটকে পড়ে যাই। পরে দেখি আমাকে সবাই ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারলেও তখন কিছুই বলতে পারিনি।’

বগুড়ায় রথযাত্রায় রথের চূড়ার সঙ্গে ১১ কেভি বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় আহত ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দুষলেন রথের নিরাপত্তায় অবহেলা ও ধর্মীয় নেতাদের উদাসীনতাকে। এদিকে এ ঘটনায় রাতেই কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। জেলা প্রশাসনও ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

রবিবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে বগুড়া শহরের সেউজগাড়ি আমতলা মোড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল গ্রামের রঞ্জিতা (৬০), আদমদীঘি উপজেলার কু-ু গ্রামের নরেশ মহন্ত (৬০), সদর উপজেলার তিনমাথা রেলগেটের আতসী রানী (৪০), শিবগঞ্জ উপজেলার কুলুপাড়া গ্রামের অলক কুমার (৪২), সারিয়াকান্দি উপজেলার জলী রানী সাহা (৩৫)। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৪২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আহতদের পরিবারের লোকজনের দাবি, রথযাত্রায় থাকা শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক ছিল। নিরাপত্তায় তাদের থাকার কথা। ঘটনার সময় রথের চূড়া নামানোর দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকরা আনন্দ-উল্লাসে ব্যস্ত ছিল। তারা সজাগ থাকলে এমনটা ঘটত না। নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবহেলা করা হয়েছে।

এদিকে রথযাত্রায় অংশ নিতে আসা সংবাদকর্মী অরূপ রতন মর্মান্তিক এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, কোনোভাবেই ধর্মীয় নেতারা এর দায় এড়াতে পারেন না। যখন রথের চূড়ার সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শ হলো, তখন শত শত নারী-পুরুষ বিদ্যুতায়িত হয়। এর মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন। অর্ধশত আহত হয়েছেন। রথে চূড়ার ওঠানামা করার দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবক যারা ছিল, তাদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসকন মন্দিরের এক ভক্ত বলেন, এত স্বেচ্ছাসেবক, তবু চূড়া কেউ নামাল না, এতগুলো জীবন গেল। ধর্মীয় নেতারা সব সময় সামনে থাকেন। রথের নিরাপত্তায় যারা ছিল, তারা আনন্দ-উল্লাস না করে যদি খেয়াল রাখত, তাহলে এমন ঘটনার সাক্ষী হতে হতো না। ধর্মীয় নেতাদেরও দায় রয়েছে এ ঘটনায়।

বগুড়ার পৌর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, ‘ঘটনার সময় আমরা সামনে ছিলাম। পরে গিয়ে হতাহত মানুষদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় আমরা শোক প্রকাশ করছি।’

বগুড়ার ইসকনের অধ্যক্ষ খোরাজিতা কৃষ্ণ দাস দুর্ঘটনার বিষয়ে বলেন, চূড়াটি ফোল্ডিং। সেটা নামানোর দায়িত্বে যারা ছিল, তারা বিদ্যুতায়িত হয়ে আটকে ছিল। বিদ্যুতের তার আছে জানা সত্ত্বে তা আগেই নামানো হলো না কেন এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার ভক্ত ছিল, আমরা চেষ্টা করেছি চূড়ার ফোল্ডার নামাতে, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।’

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) উপপরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে আইসিইউতে থাকা দুজনকে রবিবার রাতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। শজিমেক হাসপাতালে এখনো ৩৮ জন চিকিৎসাধীন আছে। বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতলে ৫ জন ভর্তি ছিল। এর মধ্যে একজন মারা গেছে।

বগুড়া নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোন্নাফ জানান, ১১ কেভি তারটি সমতল থেকে ২৮ ফুট ওপরে ছিল। সেখানে রথের চূড়ার উচ্চতা বেশি হওয়ায় তারের সংস্পর্শে এসে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত