সরকারি চাকরির সকল গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লেখিত অনগ্রসর গোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য কোটাকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে নূন্যতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাস করে কোটা পদ্ধতিকে সংস্কারের এক দফা দাবিতে সপ্তম দিনের মতো ঢাকা- আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (৯ জুলাই) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’–এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সড়ক ঘুরে প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গিয়ে শেষ হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা ৩ টা ৪৫ মিনিট থেকে সড়ক অবরোধ করা শুরু করেন। এতে সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ৩২ মিনিট অবরোধের পর বিকেল ৪ টা ১৭ মিনিটে যান চলাচলের জন্য সড়ক উন্মুক্ত করে দেন শিক্ষার্থীরা।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘সংবিধানের মূলকথা, সুযোগের সমতা’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ,’ ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’, ‘কোটা প্রথা, বাতিল চাই বাতিল চাই’, ‘কোটা প্রথার বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই’- ইত্যাদি শ্লোগান দিতে থাকেন৷
কোটা বাতিলসহ চার দাবিতে টানা আন্দোলন করে আসছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর ধারাবাহিকতা আজ মঙ্গলবার সপ্তম দিনের মতো ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। একই দাবিতে গতকাল সোমবার সোয়া চার ঘণ্টা, আগের দিন রবিবার দুই ঘণ্টা, গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ৩৫ মিনিট ও বুধবার পৌনে দুই ঘণ্টা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। এ ছাড়া গত সপ্তাহের সোমবার ১০ মিনিট ও মঙ্গলবার ২০ মিনিট, বুধবার ৫৫ মিনিট সড়ক অবরোধ করেন তারা।
সে সময় শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবিতে আন্দোলন করলেও গতকাল সোমবার তারা এক দফা দাবির ঘোষণা দেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আজ তারা দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেডের' অংশ হিসেবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এর আগে আন্দোলনকারীদের চার দফা দাবিগুলোর মধ্য ছিল- ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখা, ২০১৮ এর পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সকল গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে, দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচিতে অনড় রয়েছে শিক্ষার্থীরা। এদিকে সার্বজনীন পেনশন স্কিম বাতিলের দাবিতে সর্বাত্মক কর্মবিরতি কর্মসূচী পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
অবরোধ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান লাবিব বলেন, ‘ আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছিলাম বৈষম্য নিরসনের জন্য। আবার যদি বাংলায় কোনো বৈষম্য হয় আমরা আবারও রাজপথে নামতে প্রস্তুত। বৈষম্য নিরসন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘১৯৭২ সালে যখন মুক্তিযোদ্ধা কোটা চালু হয় তখন বলা হয়েছিল - এটি অন্তবর্তীকালীন সিদ্ধান্ত। এত বছর পরেও সেই অন্তবর্তীকালীন সময় পার হয় নি। এখনও মুক্তিযোদ্ধাদের তৃতীয় প্রজন্মের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা প্রথা বহাল থাকার যৌক্তিকতা নাই। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার সব কোটা বাতিল ঘোষণা করে। এর কারণ ছিল আমাদেরকে সব ধরণের কোটা বিরোধী হিসেবে তুলে ধরা। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য- আমরা কোটার যৌক্তিক সংস্কার চাই। তবে সেটা শুধু অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্য।’
২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। ওই বছর কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশ করার দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনে নেমেছিলেন। আন্দোলনের মুখে একপর্যায়ে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে পুরো কোটাব্যবস্থাই বাতিল করে। ওই বছরের ৪ অক্টোবর কোটা বাতিলবিষয়ক পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে ২০২১ সালে সেই পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রিট করেন। ৫ জুন এই রিটের রায়ে পরিপত্রের ওই অংশ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে আবার আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’–এর ব্যানারে ১ জুলাই থেকে টানা আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা।
খালেদা জিয়া তো মুক্ত, তাকে কিভাবে মুক্তি দেব: আইনমন্ত্রী
প্রশ্নফাঁস: আবেদ আলীর ছেলে সিয়ামসহ ১০ জন কারাগারে