পরীক্ষা ছিল এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের। কিন্তু পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র। এ নিয়ে হইচই হওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা দেরিতে প্রথম পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সীতাকু-ের বিজয় স্মরণী কলেজ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে।
এমন ভুল কীভাবে হলো খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র বাছাইয়ের দুই স্তরেই ভুল করেছে সীতাকু-ের বিজয় স্মরণী কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও পরীক্ষা কমিটি।
ভুল প্রশ্নপত্র পরীক্ষার হল পর্যন্ত কীভাবে গেল, এই প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। জানা গেছে, প্রশ্নপত্র পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের কাছে যাওয়ার আগে অন্ততপক্ষে তিন স্তরে ক্রস চেক হয়ে থাকে। কোথাও তা শনাক্ত হলো না। তাহলে পরীক্ষা কমিটি কী কাজ করে, এ প্রশ্ন অভিভাবকদের কাছ থেকেই উঠেছে। অভিভাবকদের দাবি, ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের সঙ্গে যারা জড়িতম তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরীক্ষা শুরুর প্রায় এক মাস আগে ঢাকার বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নের প্যাকেট জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে চলে আসে। ট্রেজারিতে প্রশ্নগুলো আসার পর ট্রেজারির দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার একটি রুটিন করে দেন। সেই রুটিনে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর প্রতিনিধিদল ট্রেজারি অফিসে গিয়ে বিজি প্রেস থেকে আসা প্রশ্নগুলো বাছাই করে পরীক্ষার রুটিন অনুযায়ী বিষয় ও বিষয়কোড অনুযায়ী নতুন করে পৃথক খাম তৈরি করেন। সেই খামে রুটিন অনুযায়ী নির্ধারিত দিনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থাকে। পরবর্তীকালে পরীক্ষার দিন সকালে নির্ধারিত দিনের খাম ট্রেজারি অফিস থেকে কেন্দ্রগুলোর প্রতিনিধিরা নিয়ে আসবে এবং কেন্দ্রে এসে সেই খাম খোলা হয়। খাম খোলার পর ফয়েল পেপারের (যে খামে প্রশ্ন থাকে) ওপর লেখা বিষয় কোড যাচাই করবেন। পরীক্ষার রুটিন অনুযায়ী, ফয়েল পেপারের ওপর দেওয়া বিষয় কোড সঠিক হলে ফয়েল পেপার কেটে প্রশ্নপত্র বের করে পরীক্ষার হলের কক্ষভিত্তিক বণ্টন করেন। যদি পরীক্ষার বিষয়ের সঙ্গে ফয়েল পেপারের ওপরের বিষয় কোডের মিল না থাকে, তাহলে ফয়েল পেপার কাটা হয় না। আর এ পুরো কাজটি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের পরীক্ষা কমিটি সম্পাদন করে থাকেন। এ কমিটিকে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন কেন্দ্র সচিব।
ট্রেজারি অফিসে প্রশ্নপত্র বাছাই বিষয়ে কথা হয় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আল আমিন হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে ও কেন্দ্র সচিবের চিঠি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা ট্রেজারি অফিসে প্রবেশ করে প্রশ্নপত্র বাছাই করেন। এ সময় উনারা প্রশ্নপত্র থাকা ফয়েল পেপারের প্যাকেটগুলো থেকে পরীক্ষার রুটিন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্নগুলো নিয়ে নতুন আরেকটি প্যাকেট তৈরি করেন। সেই প্যাকেটের ওপর পরীক্ষার তারিখ, বিষয় ও বিষয় কোড লেখেন। এসব কাজ সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা করেন। পরীক্ষার দিন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে নির্ধারিত দিনের প্যাকেট নিয়ে যান।’
তাহলে বাছাই করার সময় এক দিনের পরীক্ষার দিন আরেক দিনের প্রশ্নপত্র ঢোকানোর সুযোগ রয়েছে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে আল আমিন বলেন, কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা এমন ভুল করতেই পারেন। এজন্য কাজটি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। এজন্য ট্রেজারি অফিস থেকে কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র নিয়ে যাওয়ার পর ফয়েল পেপার কাটার আগে বিষয় কোড আরেকবার মিলিয়ে নিতে হয়। গতকালের পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ কাজটি করেননি। যদি করতেন তাহলে তখনই ভুলটি শনাক্ত হয়ে যেত।
একই কথা বলেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা (শিক্ষক) যদি সঠিকভাবে প্রশ্নপত্র বাছাই করতেন তাহলে এ ভুল হতো না। আবার পরীক্ষার দিন সকালে ফয়েল পেপার কাটার আগে বিষয় কোড মিলিয়ে নিলেও এই ভুল হতো না। কারণ ফয়েল পেপারের ওপর বিজি প্রেস থেকে বিষয়, পত্র ও বিষয় কোড লেখা থাকে। সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র বিতরণের আগে কক্ষ পরিদর্শক বিষয় ও বিষয় কোড খেয়াল করার কথা। সেখানেও তা শনাক্ত না হওয়াতেই পরীক্ষার্থীর হাত পর্যন্ত প্রশ্নপত্র গিয়েছে।’
পরীক্ষার কেন্দ্রে এই ভুল হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বিজয় স্মরণী কলেজের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সীতাকু- উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম রফিকুল ইসলাম। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা পরিচালনায় নিয়োজিত শিক্ষকরা ক্রস চেকগুলো সঠিকভাবে করলে ভুল এড়ানো যেত। তারপরও আমি একটি তদন্ত কমিটি করেছি, এ ছাড়া জেলা প্রশাসন থেকেও তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এ ঘটনায় কারা দোষী তা বের হয়ে আসবে।’
এদিকে এ ঘটনায় কলেজটির অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিবের দায়িত্বে থাকা শিব শংকর শীল ও আহ্বায়কের দায়িত্বে থাকা আবদুল্লাহ আল নোমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, সকাল ১০টায় যথানিয়মে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র বিতরণ হয় এবং পরীক্ষার্থীরাও পরীক্ষা দেয়। পরে ১০টা ৩০ মিনিটে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র বিতরণ করার পর শিক্ষার্থীরা দেখতে পায় দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র। তখনই কেন্দ্রে হইচই পড়ে যায়। এরপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিতরণকৃত প্রশ্নপত্র ফেরত নেওয়া হয়। কেন্দ্রে প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র না থাকায় জেলা প্রশাসনের ট্রেজারি থেকে প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে দুপুর ১২টায় পরীক্ষা শুরু করা হয়।
ফারজানা লাকী নামে এই কেন্দ্রের এক শিক্ষার্থী জানান, নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র ঠিক থাকলেও সৃজনশীল প্রশ্নপত্র ভুল দেওয়া হয়। পরে আমাদের হইচই শুনে প্রশ্নপত্র ফেরত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন এনে দুপুর ১২টায় শুরু হয়। তাই পরীক্ষা নিয়ে খুব টেনশন হয়েছে।
এ ভুলের কারণে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে স্বাভাবিক ছন্দে পরীক্ষা দিতে পারেননি। তারা টেনশনে ছিলেন এতে পরীক্ষাও ভালো হয়নি বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
যেহেতু দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে তাই বিকল্প প্রশ্নপত্রে পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা হবে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
উল্লেখ্য, বিজয় স্মরণী কলেজে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৩৩ জন। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষার্থী ছিল ৩৬০ জন।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন আমাদের সীতাকু- প্রতিনিধি
