বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক ডা. পবিত্র কুমার দেবনাথের পর এবার সব নিয়ম পায়ে মাড়িয়ে এমডি কোর্সের ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছেন আরেক চিকিৎসক। এই চিকিৎসকের নাম ইফতেখার আহমেদ বাপ্পি, তিনি মাতুয়াইল শিশু-মাতৃস্বাস্থ ইনস্টিটিউটের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ইফতেখার আহমেদ বাপ্পি আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক।
নিয়ম অনুযায়ী, এমডি কোর্সের একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাছুটি নিয়ে পূর্ণকালীন রেসিডেন্সি হিসেবে পড়াশোনা করতে হয়। শিক্ষাছুটিতে থাকা অবস্থায় তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা কিংবা কর্মক্ষেত্রে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তবে এসব নীয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিয়মিত ক্লাস, টিউটেরিয়াল ও থিসিস গবেষণা না করেই ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্লিয়ারেন্স পেয়েছেন ইফতেখার আহমেদ বাপ্পি। নিয়ম ভেঙে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে এ পরীক্ষায় অংশ নিতে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে।
ইফতেখার আহমেদ বাপ্পি ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে একটা ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইভিনিং কনসালটেন্সি ও প্রশিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানসহ অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রম পালন করেছেন। তার নিয়মিত ডিউটি রোস্টার ও দায়িত্ব পালনের তথ্য প্রমাণ রয়েছে দেশ রূপান্তরের হাতে।
একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ডা. ইফতেখার আহমেদ বাপ্পি ৯ ও ১১ জুলাই এমডি কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার জানামতে ইফতেখার আহমেদ কর্মরত নয় তিনি শিক্ষার্থী হিসেবেই এমডি কোর্সের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বিভাগ থেকেও আমাকে তাই জানানো হয়েছে। ডিউটি রোস্টারে তার নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে তিনি খোঁজ নিয়ে জানবেন।
মাতুয়াইল মাতৃ-স্বাস্থ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, ইফতেখার আহমেদ ৮০ শতাংশ ক্লাসেই অনুপস্থিত ছিলেন। কিছুদিন পরপর তিনি ক্লাস করতে যেতেন এবং এক সাথে সব অ্যাটেন্ড দিয়ে রাখতেন। তিনি থিসিসের ক্লাস না করেই থিসিস পেপার জমা দিয়েছেন যেখানে নানা অসংগতি থাকার পরও তাকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে। এমডি কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতি পান। ডিগ্রি অর্জনের পর ওই শিক্ষার্থী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে চেম্বার করবেন, এবং হাসপাতাল ও চেম্বারে জটিল রোগীদের চিকিৎসা করবেন। ফলে তাকে যথেষ্ট দক্ষ হয়ে উঠতে হয়। এসব যুক্তি দেখিয়ে তারা জোরালো প্রতিবাদ জানালেও তাতে কর্ণপাত করেননি শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ওয়াহিদা খানম। ইফতেখার আহমেদ স্বাচিপের নেতা হওয়ায় তার দাপটের কারণে বিভাগের শিক্ষকরা নিরুপায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ওয়াহিদা খানমকে ফোন দেওয়া হলে তিনি ব্যস্ত আছেন জানিয়ে ১ ঘণ্টা পর ফোন দিতে বলেন। ১ ঘণ্টা পর তাকে আবার কল দিলেও তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন রেখে দেন এবং আর কখনো ফোন রিসিভ করেননি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যে শিক্ষার্থী কোনো ক্লাস করেননি, তিনি তো কিছু শিখতে পারলেন না। এমডি কোর্সে হাতে কলমে শিখতে হয় ফলে এখানে ক্লাস না করে কোনো কিছু শেখা অসম্ভব। এখন যে শিক্ষার্থী যোগ্য নয় তিনি যখন একটা বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি পান তাতে রোগীদের ঝুঁকি বাড়বে। এটা কোনোভাবেই ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। আমি যখন ঢাকা মেডিকেলে কর্মরত ছিলাম তখনও এরকম অনেক শিক্ষার্থীর জন্য তদবির আসত, তারা নিজেরাও বড় ছাত্র নেতা ছিলেন। কিন্তু কখনো এমন তদবির বা আবদার মেনে নেইনি। এখন যারা প্রতিষ্ঠান প্রধান আছেন তারা কেনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের ও কঠোর হওয়া উচিত।
দেশের চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসির) ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া কিংবা না দেওয়া ইনস্টিটিউট বা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের এখতিয়ার। এখন তিনি অনিয়মের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন কি না সে বিষয়ে আমাদের জানার সুযোগ নেই। এরপরও যদি আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করে তাহলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
