উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে যমুনা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে বানভাসি মানুষদের দুর্ভোগ কমছেই না। দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। গত দুই সপ্তাহ ধরে কোনো কাজকর্ম না থাকায় উপার্জনশূন্য হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নিম্নআয়ের লোকজন। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে নিরাপদ স্যানিটেশন, গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাব। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগ। উপজেলার চরাঞ্চলসহ ৪টি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
গত শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চল কালিপুর, জয়পুর, পুংলীপাড়া, রেহাইগাবসারা, চন্ডিপুর, মেঘারপটল, রাজাপুর ও অর্জুনা ইউনিয়নের শুশুয়া, বাসুদেবকোল, ভদ্রশিমুলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েকদিন ধরে একটু একটু করে পানি কমছিল। কিন্তু গতকাল থেকে ফের নতুন করে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এখনো চরের শত শত ঘরবাড়ি পানিতে ভাসছে।
টাঙ্গাইল জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে যমুনা নদীর পানি কমলেও গত শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পোড়াবাড়ি পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া জেলার ধলেশ্বরী ও ঝিনাই নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে থাকলেও জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এসব নদীতেও পানি বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চরের লোকজন তাদের গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। চরের পানিবন্দি ঘরবাড়িতে টিউবওয়েল, শৌচাগার ও রান্নাঘর তলিয়ে রয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় কাজ করছেন বানভাসি মানুষ। কিছু কিছু এলাকায় ত্রাণ পেলেও এখনো বেশির ভাগ ভুক্তভোগী পরিবার ত্রাণসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
গাবসারা ইউনিয়নের কালিপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়ির পাশে থই থই পানি। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ১৫ দিন ধরে কোনো রোজগার নেই। চরাঞ্চলে পানি থাকায় কাজকর্মও বন্ধ। ধার-দেনার টাকায় কোনোমতে সংসার চালাচ্ছি। এখন পরিবার নিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছি। নদীর পানি একেবারে না কমা পর্যন্ত চরের জনজীবন স্বাভাবিক হবে না। সরকার যদি এ সময়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা করত, তাহলে অনেক উপকার হতো।’
একই এলাকার বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, ‘টানা দুই-তিন সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি হয়ে থাকলেও আমাদের মতো দরিদ্রদের কেউ খোঁজখবর নেয় না। নোংরা পানির কারণে হাত-পায়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শিশুরা ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে ভুগছে। এখনো কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা মেলেনি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশীদ বলেন, ‘উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে চরাঞ্চলসহ ৪টি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ও জেলা প্রশাসক মহোদয়ের দিকনির্দেশনায় দেড় হাজারেরও বেশি দরিদ্র মানুষের মধ্যে মানবিক সহায়তা হিসেবে শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও পানি মজুদ রাখার পাত্র বিতরণ করা হয়েছ। তাছাড়া পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীও দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসহ আমাদের সব ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকবে।’
