মার্কিন রাজনীতিতে রক্তের দাগ

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪, ০৯:২৮ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চার মাস আগে নির্বাচনী সমাবেশে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডেনাল্ড ট্রাম্পকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা হয়েছে। যাকে বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অন্ধকার ও বিপজ্জনক অধ্যায়। এমনটি যে এর আগে ঘটেনি তা নয়; যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হামলায় নিহত হয়েছেন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রক্তাক্ত হতে দেখল বিশ্ববাসী।

গত শনিবার সন্ধ্যায় পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের বাটলার এলাকায় ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। গুলি তার ডান কান ছুঁয়ে যায় এবং তিনি মঞ্চে বসে পড়েন। গুলির শব্দে নিরাপত্তারক্ষীরা চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরেন। এরপর ট্রাম্প যখন উঠে দাঁড়ান, তখন তার কান থেকে গালের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। আহত ট্রাম্পকে মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়তে থাকেন এবং বলতে থাকেন ‘ফাইট! ফাইট! ফাইট!’ পরে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে নিউ জার্সির বাড়িতে ফিরেছেন তিনি। পরে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমাকে গুলি করা হয়েছে। গুলি আমার ডান কানের ওপরের অংশ চিরে দিয়ে গেছে। অনেক রক্ত ঝরেছে।’

আততায়ীর গুলিতে সমাবেশে আসা এক রিপাবলিকান সমর্থকের প্রাণ গেছে, গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন। পরে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার গুলিতে ওই হামলাকারী নিহত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) জানিয়েছে, হামলাকারীর নাম টমাস ম্যাথিউ ক্রুকস। তিনি পেনসিলভানিয়ার বেথেল পার্কের বাসিন্দা। তার বয়স ২০ বছর। হামলাকারী তরুণ সমাবেশের মঞ্চ থেকে ১৩০ গজ দূরে একটি ভবনের ছাদ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে কমপক্ষে আটটি গুলি ছুড়েছেন। তিনি রিপাবলিকান পার্টির একজন ভোটারও।

হামলার ঘটনায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিকিউরিটি সার্ভিসের দিকে আঙুল তুলছেন অনেকে। বলা হচ্ছে, এ পরিস্থিতি ‘সিক্রেট সার্ভিসের ব্যর্থতা’ ছাড়া আর কিছু নয়। ট্রাম্প নিজে অবশ্য সিক্রেট সার্ভিস এবং অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আর সিকিউরিটি সার্ভিস বলেছে, সমাবেশের নিরাপত্তার জন্য যে এলাকা ঘিরে তারা নিরাপত্তার আয়োজন সাজিয়েছিল, গুলি হয়েছে তার বাইরে থেকে। তারা এ ঘটনা ‘হত্যাচেষ্টা’ বিবেচনা করেই তদন্ত শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এ হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তারা কী ধরনের কথা বলেছেন সেটি ওই কর্মকর্তারা বলেননি। বাইডেন বলেছেন, ‘এ ধরনের সহিংসতার কোনো জায়গা আমেরিকায় নেই। এটা জঘন্য, জঘন্য। তিনি নিরাপদ ও ভালো আছেন শুনে আমি কৃতজ্ঞ। আমি তার এবং তার পরিবার ও সমাবেশে যারা ছিলেন তাদের সবার জন্য প্রার্থনা করছি। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় জিল ও আমি সিক্রেট সার্ভিসের কাছে কৃতজ্ঞ।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস বলেছেন, ট্রাম্প গুরুতর আহত না হওয়ায় তিনি ‘স্বস্তিবোধ’ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তার জন্য, তার পরিবার এবং যারা আহত হয়েছে তাদের জন্য প্রার্থনা করছি।’

এ ঘটনায় বিশ্বনেতারা নিন্দা জানিয়েছেন। তারা ‘বিস্ময়, হতাশা ও শঙ্কা’ প্রকাশ করে বলছেন, ‘গণতন্ত্রে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

আগামী ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের দ্বৈরথের মাত্র চার মাস আগে এ গুলির ঘটনা দুই দলের শীর্ষ নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে এ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন।

রিপাবলিকানদের প্রতিক্রিয়া : রিপাবলিকান পার্টির বহু রাজনীতিক এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে টেনেসির সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন, কানসাস সিনেটর রজার মার্শাল, গাই রেসচেনথেলার এবং টিম বারশেট। সামাজিক মাধ্যম এক্সে তারা পোস্ট করেছেন ‘ট্রাম্পের জন্য প্রার্থনা’।

সাবেক স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পের জন্য প্রার্থনা করছি।’ কংগ্রেসম্যান অ্যান্ডি বিগস লিখেছেন ‘ঈশ্বর তার পরিবারের মঙ্গল করুন। নিউ ইয়র্ক থেকে নির্বাচিত হাউজ রিপাবলিকান কনফারেন্সের চেয়ারম্যান এলিস স্টেফানিক লিখেছেন, ‘দয়া করে ট্রাম্প, তার পরিবার এবং সমাবেশে যোগ দেওয়া সব দেশপ্রেমিকের জন্য প্রার্থনা করুন।’

বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া : যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনায় ‘বিস্ময়, হতাশা ও শঙ্কা’ প্রকাশ করেছেন বিশ^নেতারা।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনায় আমি ও আমার স্ত্রী সারা ব্যথিত। তার (ট্রাম্প) নিরাপত্তা এবং দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য আমরা প্রার্থনা করছি।’

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি ‘আতঙ্কিত’ বোধ করছেন। এক্সে এক পোস্টে স্টারমার লিখেছেন, ‘আমরা তার (ট্রাম্প) ও তার পরিবারের প্রতি শুভকামনা জানাচ্ছি।’

এক্সে এক পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, ‘আমার বন্ধু সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলায় আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

এক্সে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো লিখেছেন, ‘সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর গুলির ঘটনায় আমি অসুস্থবোধ করছি।’

জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, এমন যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই কঠোরভাবে দাঁড়াতে হবে।’

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘আমাদের গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো স্থান নেই। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গুরুতর আহত হননি, সেটা আমাদের সবার জন্যই স্বস্তির। মিশেল ও আমি তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।’

রিপাবলিকান দলের সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছেন, ‘কাপুরুষোচিত হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নিরাপদে আছেন তাতে আমি ও লরা কৃতজ্ঞ। সিক্রেট সার্ভিসের নারী ও পুরুষ সদস্যরা দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করছি।’

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ বলেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন রয়েছে, সেটা রাশিয়া বিশ্বাস করে না। তবে এ প্রশাসনই এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যেটা এ ঘটনা উসকে দিয়েছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বললেন :  গ্রেইগ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে বলেছেন, তিনি সমাবেশে বাইরে ছিলেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট কী বলছিলেন সেটিই শুধু শুনতে পারছিলেন। তখনই ছাদে থাকা এক ব্যক্তি তার নজরে আসে। তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ করি আমাদের পাশের ভবনের ছাদে সে অগ্রসর হচ্ছে। ৫০ ফুট দূরে ছিল আমাদের থেকে। তার কাছে একটা রাইফেল ছিল। আমি ভাবছিলাম ট্রাম্প কেন এখনো বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছেন। তাকে কেন স্টেজ থেকে নামানো হচ্ছে না। এরপরই গুলির শব্দ।’

জেন ও থেরেসা নামে আরও দুজন প্রত্যক্ষদর্শী বাটলার কাউন্টির ওই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। বিবিসি নিউজকে তারা জানিয়েছেন, ছয় থেকে আটটি গুলির শব্দ শুনেছেন তারা। থেরেসা নামে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি ঠাস করে একটা শব্দ শুনলাম, একটু পর আবার দুটি শব্দ হলো। আমি তখন বুঝতে পারছিলাম যে এটা গুলি।’

রিপাবলিকান সম্মেলনে যাবেন ট্রাম্প : ট্রাম্পের প্রচার দল জানিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী সপ্তাহে তিনি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে যোগ দেবেন। ওই সম্মেলনে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। সোমবার ওই সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা, যেখানে ট্রাম্প তার ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে। প্রচার দল জানিয়েছে, ট্রাম্প ‘ভালো আছেন’ এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, যারা হামলার প্রাথমিক জবাব দিয়েছে।

ট্রাম্পের ছেলের বিবৃতি : ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তার বাবা ভালো আছে। বলছিলেন, ‘আমি মাত্রই আমার বাবার সঙ্গে কথা বলেছি এবং তিনি ভালো আছেন। আমেরিকাকে রক্ষার লড়াই তিনি কখনোই বন্ধ করবেন না, উগ্রবাদীরা কী ছুড়ল, তাতে কিছু যায় আসে না।’ তবে তিনি ট্রাম্পের সমাবেশে ছিলেন না বলে সিবিএস নিউজ নিশ্চিত করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণার ধরনটাকে বদলে দেবে : বিবিসির নর্থ আমেরিকা এডিটর সারাহ স্মিথ লিখেছেন, মুখে রক্ত নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মুষ্টিবদ্ধ হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন এবং সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা তাকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন এ ছবি শুধু ইতিহাস বানায়নি, বরং এগুলোই নভেম্বরের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে। জঘন্য এ রাজনৈতিক সহিংসতার নিঃসন্দেহে প্রভাব পড়বে নির্বাচনী প্রচারণায়।

বাইডেনের নির্বাচনী প্রচার দল সব ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি বন্ধ রেখেছে এবং দ্রুতই টেলিভিশন বিজ্ঞাপনগুলো না দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কারণ তাদের বিশ্বাস, ট্রাম্পের ওপর হামলার এ সময়ে এগুলো মানানসই হবে না, বরং যা ঘটেছে তার নিন্দা জানানোর দিকে মনোযোগ দেওয়াই হবে শ্রেয়।

আমেরিকার রাজনীতির অন্ধকার ও বিপজ্জনক অধ্যায় : বিবিসির নর্থ আমেরিকা করেসপন্ডেন্ট অ্যান্থনি জার্চার লিখেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলা দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পেইনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। আমেরিকার রাজনীতিতে সিকিউরিটি ও সেফটির যে ধারণা গত কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে, সেটি নাটকীয়ভাবে বিপর্যস্ত হলো।

১৯৮১ সালে গুলিতে রোনাল্ড রিগ্যান গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কোনো প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ওপর এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত