অবাস্তবায়নযোগ্য লুটেরা বাজেট

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০২:৪০ এএম

বিএনপি সরকারের উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে উচ্চাভিলাষী এবং লুটপাটের বাজেট আখ্যা দিয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। বাজেটের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে দলটি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘উপস্থাপিত বাজেট ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এতে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। ঘাটতি কোথা থেকে পূরণ করা হবে তাও স্পষ্ট নয়।’ তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে এ উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটনির্ভর বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও জনকল্যাণমূলক বাজেট উত্থাপনের জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বলা হয়েছে বাজেটের ব্যয়সংকুলান ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না; স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

জামায়াতের মতে, উপস্থাপিত বাজেট বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে; লাগামহীনভাবে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ তিন বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট আশা করেছিল। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘কর-প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে কার্যকরী সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে তিন লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে এডিপির আকার বাড়ালে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’ 

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বাজেটে সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট। প্রথমত এনবিআরের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা; নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত কর-প্রশাসন প্রয়োজন, যা এখনো গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ; সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রেও সরকার কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি। এ ছাড়া দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের চাপ সামাল দেওয়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের সঙ্গে বিএনপি সরকারের বাজেটের তুলনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, আর জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা।’ তিনি বলেন, ‘সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি।’

গোলাম পরওয়ার আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার গঠনমূলক প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে বাজেট সংশোধন করবে এবং বিশেষত ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংকের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের এ নেতা বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা-কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমিরে জামায়াত সংসদে তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার যে মূল্যে নেওয়া হয়েছে, সেই মূল্যে ফেরত দেওয়া হোক। একইভাবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পরিবর্তন করে রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতারও আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।’

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য রেজাউল করিম ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত