প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে উচ্চ আকাঙ্ক্ষার বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, প্রস্তাবনার ৮০ ভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় দেশ রূপান্তরের এক প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের সব শ্রেণি- পেশার মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দলীয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব পাবে না। দলীয়করণের মাধ্যমে বৈষম্য সৃষ্টি করার নীতি সরকারের নেই।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অর্থমন্ত্রী বাজেট তৈরির প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন উপস্থিত মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি, মৎস্য ও পানি সম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক-টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি। এ সময় বিদ্যুৎ-জ্বালনি; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাত-বিষয়ক প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশাল এ ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের রজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোট টাকা। ফলে বাজেটের আকারের তুলনায় ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসহ থেকে ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৩ লাখ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেট তৈরির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘একটা অর্থবছরের বাজেট তৈরিতে কমবেশি ছয় মাস সময় লাগে। সেখানে আমরা মাত্র দেড় থেকে দুই মাসে এবারের বাজেট পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা তৈরি করেছি। তার মধ্যে এবারের বাজেট তৈরির প্রেক্ষাপটাও ভিন্ন ছিল। বিগত সময়ে দেশে ফ্যাসিবাদী সরকার, পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ছিল। ফলে দেড় দশকের বেশি সময় দেশবাসী গণতান্ত্রিক বাজেট মিস করেছে। সংবিদান বলে জনগণের ইচ্ছা ও সম্মতিতে দেশ চালাতে হবে। আমরা সে দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মানুষকে এবারের বজেটে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। আমার মনে হয় না কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণের মানুষ বাদ পড়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের কষ্ট করতে হয়েছে। কষ্ট করতে হয়েছে এ কারণে বলছি, বিগত সময়ে দেশের অর্থনীতি তথা- আর্থিকপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি উচ্চ আকাক্সক্ষার বাজেট তৈরি ছিল কঠিন। দেড় দশকের বেশি সময় দেশে পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি ছিল। সেখান থেকে বের হয়ে আসার জন্য বাজেটে সবার জন্য পরিকল্পনার পাশাপাশি রোডম্যাপ (রূপকল্প) দেওয়া আছে। সে জন্য এবারের বাজেটের ভাবনা, দর্শন ও চিন্তা ভিন্ন। এ ছাড়া বাজেট তৈরির সময়ে বিশ্বের যুদ্ধবিগ্রহ আমাদের নতুন করে সংকটে ফেলেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট। এতসব সীমাবদ্ধতার মধ্য থেকে সংকট উত্তরণে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।
সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্ন-উত্তর পর্বে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করা হয় রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই অতীতে সরকার-ঘনিষ্ঠতা, অনিয়ম ও ব্যাংক খাতের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকর্তাদের নিয়েই সরকার কীভাবে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করবে? অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অবাস্তব বলে মনে করছেন? এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, বিগত সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক ব্যক্তি ও নতুন উদ্যোক্তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অতীতে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদাররাই বেশি সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা ও বঞ্চিতদের জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী?
এর উত্তর অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা কোনো দলের জন্য বাজেট করি না, করার ইচ্ছাও নেই। বাজেট বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য। আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কোনো খাতে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে মনোনয়ন বা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না।
আমি আগেও বলেছি, বাংলাদেশের এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি এই বাজেটের আওতার বাইরে থাকবেন। কেউ হয়তো বেশি সুবিধা পাবেন, কেউ কম; কিন্তু সেটি প্রয়োজন ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে হবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। আমরা কৃষক, শ্রমিক, নারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিল্পী, কামার-কুমার-সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়েছি।
এর একটি উদাহরণ হলো ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। পাইলট প্রকল্পে যেসব কার্ড দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে বাছাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তারা নির্ধারিত মানদ-ের ভিত্তিতে উপকারভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করেছেন।
পরে আমরা এই প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখেছি, ভুলের হার মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। সেই ত্রুটিগুলোও সংশোধনের কাজ চলছে। আগামী বছরে ৪১ লাখ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেখানে ভুলের হার ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
আমাদের লক্ষ্য হলো যারা প্রকৃত অর্থে যোগ্য, তারাই যেন সুবিধা পান। নাগরিক সুবিধা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য হতে পারে না; এটি নাগরিকের অধিকার। আমরা সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা যদি বলি, তাহলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। অতীতের বিভাজন ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যোগ্যতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। ভুলত্রুটি হতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করার নীতি সরকারের নেই।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কীভাবে হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি তিন মাসের বিষয় না। এটি বিগত কয়েক বছর থেকে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আমরা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে মধ্যপ্রচ্যের যুদ্ধ নতুন করে উসকে দিয়েছে। এটা একটা দিক। আবার দেশের ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা। ঋণের সুদহার বেশি। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা মূল্যস্ফীতি বাড়তে কাজ করছে। এ ছাড়া বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ব্যবসায় ব্যয় বেশি। একজন উদ্যোক্তাকে একটা ব্যবসা শুরু করতে হলে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়। এতে সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে, যা দিন শেষে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বন্দর থেকে শুরু করে বাসা পর্যন্ত অনেক অনিয়ম হচ্ছে। এতে শিল্পব্যয় ও দ্রব্যমূল্য বাড়াতে সহায়তা করে। এসব বিষয় আমরা চিহ্নিত করেছি। ব্যবসা সহজ করা এবং পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলা তৈরিতে কাজ শুরু হয়েছে। ব্যবসায় ব্যয় কমাতে পারলে মূল্যস্ফীতি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
তিন বলেন, ‘সামনের দিনে কোনো নাগরিক সুবিধা পেতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ব্যয় হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করা যাবে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যদি কোনো গাফিলতি পাওয়া যায়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে দেশে দুর্নীতি কমবে কি না? এ প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাই বেতন সমন্বয় করা জরুরি। স্বাভাবিকভাবে মানুষের যখন অভাব থাকে তখন দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। এটা তো অস্বীকার করে লাভ নেই। গত ১১ বছর ধরে পে-স্কেল নেই, কিন্তু এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের ব্যয় মেটাতে সমস্যা হচ্ছে। বেসরকারি খাতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বাড়লেও সরকারি খাতে সেই সমন্বয় হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা আশা করছি বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি স্বাভাবিকভাবে কমবে। তাদের যখন আয় বাড়বে, তাদের যখন জীবনযাত্রা একটু উন্নত হবে। তখন নিশ্চয়ই দুর্নীতি কমবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে। ফলে আমরা পুরনো ডিজাইন থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছি। আমাদের বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে হবে। ঋণনির্ভর অর্থনীতিতে পড়ে থাকলে অগ্রসর হতে পারব না।
অনুষ্ঠানে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব এনবিআর চেয়ারম্যানকে দিতে বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, বিগত সময়ে জমি বিক্রেতারা সঠিক মূল্য উল্লেখ করতে পারে না, সেক্ষেত্রে বিক্রেতা তার বাড়তি অর্থের জন্য ২০ শতাংশ কর দিয়ে তা বৈধ করতে পারবেন। এবার তার সঙ্গে ক্রেতার ক্ষেত্রে একই সুবিধা রাখা হয়েছে। যারা ক্রয় করেন, তারাও সঠিক দাম উল্লেখ করতে পারেন না। তবে যথাযথ প্রমান উপস্থাপন বা চুক্তি দেখাতে পারলে এনবিআর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না বলা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়নি।
এ সময় অর্থমন্ত্রী এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগ করে বলেন, দেশের জমির যে মৌজা দর রয়েছে। তা সঠিক নয়। সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। সামনের দিনে মৌজা রেটগুলো সঠিক দামে সমন্বয় করা হবে। এতে কালো টাকা সাদা করার প্রসঙ্গটি থাকবে না।
প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতিতে এক বছরের প্রকল্প মেয়াদ বাড়তে বাড়তে ১০ বছরেও শেষ হয়নি। আগামীতে প্রকল্প ব্যয় কমাতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রীর দপ্তরে নির্দিষ্ট ডেস বোডে সংযুক্ত থাকবে। যেখানে প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হবে। ফলে প্রকল্প ব্যয় কমবে এবং সময় নষ্ট হবে না।