ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করাই এখন প্রধান লক্ষ্য : গভর্নর

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০২:৪০ এএম

দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা। গতকাল শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে গভর্নর এসব কথা বলেন।

গভর্নর জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ছিল। খেলাপি ঋণের হার ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। এ অবস্থায় প্রথমে খাতটিকে স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পুনঃমূলধনীকরণের ক্ষেত্রে একটি নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। যারা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, তাদের ক্ষতি সাধারণ করদাতার অর্থ দিয়ে কতটা পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে। তবে এসব সমস্যা নতুন নয়; আগের সরকারের সময় থেকেই সংকট তৈরি হয়েছিল। গত বছরের শেষ দিকে নেওয়া বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় এসব ব্যাংকের পরিশোধ কার্যক্রম চলছে। সংকটাপন্ন কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ ব্যাংকের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক নিয়ে ছড়ানো গুজবের প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। তিনি জানান, পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) একীভূত করার কাজ চলছে। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া হলেও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এর অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপ করেনি। পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় তাকে পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে ঋণ অনুমোদন, নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা অন্যান্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করেনি।

তিনি বলেন, ব্যাংকটিকে অস্থিতিশীল করার কিছু প্রচেষ্টা দেখা গেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে সেগুলো প্রয়োগ করা হবে। আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা দেবে।

নিজের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ঋণখেলাপির অভিযোগের বিষয়ে গভর্নর বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কখনো উৎপাদন বা রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ করেনি এবং ব্যাংকের ঋণও নিয়মিত পরিশোধ করেছে। সুদের হার বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ মহামারী ও অন্যান্য কারণে কিছু বিলম্ব হলেও প্রতিষ্ঠানটি কখনো ঋণখেলাপি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে গভর্নর বলেন, সরকার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের সাফল্যের হার সাধারণত খুব কম এবং এ প্রক্রিয়ায় সাত থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তারপরও সরকার এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি জানান, বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে প্রায় ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। একটি যৌথ তদন্ত দলও নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতিমধ্যে কিছু অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে। গভর্নর বলেন, যারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে, তাদের কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।

ব্যাংক খাতের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের (এনবিএফআই) দীর্ঘদিনের সমস্যাও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আমানতের অর্থও পর্যায়ক্রমে ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত