স্ট্যান্ড রিলিজের পরও পদ আঁকড়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা!

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪, ০৭:৪১ এএম

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে আসা বদলির নির্দেশ উপেক্ষা করে আগের কর্মস্থলেই অফিস করছেন পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাশেদুল কবীর। দাপ্তরিক আদেশে তাকে পাবনা থেকে অবমুক্ত করা হলেও, নিয়মিতভাবেই ব্যবহার করছেন সরকারি গাড়ি, নিচ্ছেন সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা। তবে তার এমন কাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে কার্যালয়টির দাপ্তরিক কাজে।

নথি বলছে, চলতি বছরের গত ২৯ এপ্রিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রাশেদুল কবীরসহ অন্যান্য কার্যালয়ের ১২ কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। রাশেদুল কবীরকে পাবনার পাশের জেলা নাটোরের জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে এবং নাটোরের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে পাবনায় বদলি করা হয়।

১৫ মে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মোস্তাফা মাহমুদ সরোয়ার স্বাক্ষরিত একটি পত্রে ওই মাসের ২১ তারিখের মধ্যে বদলি করা কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। পত্রে বলা হয়, নির্দেশ অমান্য করে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান না করা কর্মকর্তারা ২৩ মে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন।

গতকাল রবিবার পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে উপপরিচালক রাশেদুল কবীরকে পাওয়া যায়নি। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি অফিসে আসেননি। তবে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নির্দেশ অমান্য করে এখনো পাবনাতেই নিয়মিত অফিস করছেন তিনি। অথচ সার্ভিস রুলের ৮১ ধারা অনুযায়ী, বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রস্তুতির জন্য একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ছয় দিন সময় পান। একই শহরে বদলি হলে প্রস্তুতির সময় পান না।

আদেশ অনুযায়ী, ওই অফিসের সহকারী পরিচালক খন্দকার গোলাম সরওয়ারকে ভারপ্রাপ্ত করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও রাশেদুল কবীর তা করেননি। বদলিকৃত কর্মস্থলেও যোগদান করেননি। উল্টো মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বদলির নির্দেশের তোয়াক্কা না করে বহাল তবিয়তে বদলির আগের কর্মস্থলেই অফিস করছেন। ব্যবহার করছেন সরকারি গাড়ি ও নিচ্ছেন সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা।

জানা গেছে, গত বছরেও বদলির আদেশ হয় এই কর্মকর্তার। তদবির করে সেই আদেশ বাতিল করান তিনি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, রাশেদুল কবীর কী এমন অতিরিক্ত সুবিধা পান এই অফিসে? যে কারণে পাবনার কর্মস্থল কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চান না।

ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক খন্দকার গোলাম সরওয়ার বলেন, ‘আমি এখনো দায়িত্ব বুঝে পাইনি। স্যার (রাশেদুল কবীর) জানিয়েছেন, ওই বদলির আদেশ নাকি সংশোধন হবে।’

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, অবমুক্ত হওয়ার পর ১৫ দিনের মতো কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেননি রাশেদুল কবীর। এতে করে উপজেলা থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে নানা রকম বিল, ট্রেনিং ও টেন্ডার প্রক্রিয়া থেমে যায়। সার্বিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। পরে এগুলো নিয়ে সমালোচনা উঠলে আবার নিয়মিতই সব ফাইলে স্বাক্ষর করছেন। আগের মতো বহাল তবিয়তেই অফিস করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজসেবা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক নিরপত্তা ভাতাসহ বিভিন্ন প্রকল্প থেকে নয়ছয় করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন রাশেদুল কবীর। নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য টিএডিএ বিল থেকে শুরু করে যে সম্মানী বরাদ্দ থাকে, তা নামমাত্র একটি অংশ দিয়ে পুরোটাই আত্মসাৎ করেন তিনি। ক্যানসার চিকিৎসা সহায়তা সেবা ও নামে-বেনামে দুস্থ বা অসহায়দের বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নামেও লুট করেছেন বিপুল অর্থ। তবে তিনি কর্মকর্তা হিসেবে কৌশলী হওয়ায় সেগুলোর সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রাখেন না। ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তিনি এসব কর্মকা- চালিয়ে থাকেন। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেন না।

তবে, দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে পারিবারিক কারণে পাবনায় অবস্থান করছেন বলে জানান রাশেদুল কবীর। অবমুক্ত হওয়ার পরও কীভাবে অফিস করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ছেলের পরীক্ষা বিবেচনায় বদলির আদেশের বিপরীতে মাত্র কয়েকটি মাস সময় চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। মন্ত্রণালয় থেকে মৌখিকভাবে অফিসের সব কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে।’

মৌখিক অনুমতিতে এভাবে অফিস পরিচালনা করা যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটি মন্ত্রণালয়কে জিজ্ঞেস করতে হবে। আমি তাদের অনুমতিতেই অফিস করছি।’

এ ব্যাপারে পাবনার জেলা প্রশাসক মু. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নির্দেশনা অমান্য করে অফিস করার সুযোগ নেই। স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টি আমি জানি না, খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত