বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আজ ঐতিহাসিকভাবে অপরাজনীতির শিকার হচ্ছে। তারা নিজেদের মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক বক্তব্যে যথার্থই বলেছেন, "যদি মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা কোটার সুবিধা না পায়, তবে কি তা রাজাকারের নাতি-নাতনিদের পাওয়া উচিত?" (প্রধানমন্ত্রীর পুরো বক্তব্যের ভিডিও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কোথাও যারা আন্দোলন করছে তাদেরকে রাজাকারের নাতি-নাতনি বলেননি।) এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র একটি বাস্তব প্রশ্ন তুলেছেন যা দেশের জনগণেরও প্রশ্ন।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গতরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের এক প্রতিবাদ মিছিল সংঘটিত হয়, যেখানে তারা নিজেদের রাজাকার বলে ঘোষণা করে। এই প্রতিবাদ এবং এর পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। সেই যুদ্ধে আমাদের দেশে কিছু সংখ্যক মানুষ ছিলেন যারা পাকিস্তানের পক্ষে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন, যাদের আমরা রাজাকার বলে জানি। স্বাধীনতার পর থেকেই এই রাজাকারদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাহলে আজ কেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের রাজাকার বলে পরিচয় দিচ্ছে? এর পেছনে কীসের প্রভাব কাজ করছে?
প্রথমত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক অপব্যবহার ও ভুল তথ্যের প্রভাব পড়েছে। জিয়াউর রহমানের সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে কলমের পরিবর্তে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা পরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করেছে। এ ধরনের অপরাজনীতি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে জানছে না যে, এই কোটা একটি ধরণের পজিটিভ ডিস্ক্রিমিনেশন বা অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন।
কোটা ব্যবস্থা হলো ইতিবাচক বৈষম্য (positive discrimination) বা অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন (affirmative action) এর একটি অংশ, যা সমাজের প্রান্তিক এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমান সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে গৃহীত হয়। কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং পরিবারের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়, যা তাদের ত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রমাণ। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য এই কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদেরকে সম্মান জানিয়ে আমরা দেশের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যে ব্রেভ ফাইটারদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। তাদের জন্য কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল, যা তাদের ত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। ভারতের সংবিধানে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC), তফসিলি জাতি (SC) এবং তফসিলি জনজাতির (ST) জন্য কোটা ব্যবস্থা রয়েছে। এটি সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নতির সুযোগ দেয়।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও শিক্ষার অভাব রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও বীরত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে জানলে শিক্ষার্থীরা কখনোই নিজেদের রাজাকার বলে পরিচয় দিতে চাইবে না। বরং তারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরি হিসাবে গর্বিত করবে।
এই অপরাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে আমাদের সাহসী শিক্ষার্থীদেরই।মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে তাদেরকে এই বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি সঠিকভাবে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুঝে, তাহলে তারা অবশ্যই এই অপরাজনীতি ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রী কোথাও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতি-নাতনি বলেননি, বরং তিনি একটি প্রশ্ন তুলেছেন, যা দেশের সাধারণ মানুষের মনেও উদ্রেক করে। এই প্রশ্নটির উত্তরে শিক্ষার্থীদের ভাবতে হবে, কেন মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা কোটার সুবিধা পাবেন না? তাদের ত্যাগ ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি কি আমাদের সমাজে থাকা উচিত নয়?
কোটা ব্যবস্থা অবিলম্বে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এটি একটি নীতিগত আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা উচিত। কোটা ব্যবস্থা পুনর্গঠন নিয়ে সরকারের নীতিগত আলোচনা হওয়া উচিত। বিভিন্ন মহলের মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। কোটা ব্যবস্থার কোনো দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধনের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও কার্যকর ব্যবস্থা গঠন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোটা ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত। কোটা ব্যবস্থা আমাদের জাতির মহান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের উচিত এই বিষয়টি বোঝা এবং এটিকে সমর্থন করা। তারা যদি সত্যিই দেশের মঙ্গল চান, তাহলে তাদের উচিত হবে অপরাজনীতি বন্ধ করা এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করা।
আসুন, আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সঠিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে শিক্ষিত করি। তাদেরকে এই বিভ্রান্তি ও অপরাজনীতি থেকে মুক্ত করে একটি সুশিক্ষিত ও সচেতন সমাজের অংশীদার বানাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে আমাদের শিক্ষার্থীরা যে অবদান রাখতে পারে, তা অপরাজনীতির শিকার হয়ে নষ্ট হওয়া উচিত নয়।
আজকের ছাত্র সমাজ যদি তাদের মেধা, প্রতিভা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে আসে, তবে তারা নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। এই অপরাজনীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সঠিক ইতিহাস জানিয়ে লড়াই করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি উন্নত ও সুশিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলতে পারবো, যেখানে সকলের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
বাংলাদেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভড়কানোর অপরাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত। অতীতে আমরা দেখেছি কীভাবে জিয়াউর রহমান মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে কলম ছেড়ে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। এর ফলে মেধাবী অভিদের শীর্ষ সন্ত্যাসী হিসেবে জন্ম হয়েছিল। এই ধরনের অপকর্মের পিছনে পাকিস্তানী প্রেতাত্মারা বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। বারবার কোমলমতি ছাত্র সমাজকে ইমোশনাল করে কখনোবা ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীকে রাজাকার ঘোষণা করানো হয়, আর এখন শিক্ষার্থীদের নিজেদেরকে রাজাকার আখ্যায়িত করে স্লোগান দাওয়ানো হচ্ছে। এটা জাতির জন্য কতটা ভয়ংকর বা লজ্জার তা অনুধাবন করার বোধটুকু আজকের ছাত্র সমাজ হারিয়ে ফেলেছে।
বাঙালি জাতির মহান নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদেরকে ছোট করে বা অসম্মান করে এ জাতি কখনোই বড় হতে পারবে না। আজকের ছাত্র সমাজ যারা নিজেদেরকে রাজাকার বলে সম্বোধন করে তারা বাঙালি জাতিকে ও বাঙালি জাতির গর্বকে ছোট করার চেষ্টা করছে, তারা বিভ্রান্ত।
আমি বিশ্বাস করি, সময়ের সাহসী সন্তান- আজকের ছাত্র সমাজ অবশ্যই এই অপরাধনীতিকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে কঠোরভাবে মোকাবেলা করবে।
লেখক: ব্যারিস্টার; অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
