সাদা চুলের ব্যাকব্রাশ করা সদাহাস্য মুখের রশীদ হায়দার বাংলা সাহিত্যের অনন্য কথাশিল্পী। এক অনবদ্য নান্দনিক বাঙালি, গড়পড়তার উচ্চতার মধ্যেও তিনি ছিলেন আলাদা। বুদ্ধিদীপ্ত, একই সঙ্গে কৌতুকময় বাক্য নির্মাণ ও বিনিময়ে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। পাবনার দোহারপাড়ার মানুষ রশীদ হায়দার জন্মেছিলেন ১৯৪১ সালের ১৫ জুলাই। সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে একটি বিরল নয়, অতিবিরল পরিবারের কীর্তিমান পুরুষ ছিলেন তিনি। এক সংসারের ছয় ভাইলেখার সঙ্গে যুক্ত। কেবল যুক্ত নয়, ছিলেন এবং আছেন বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত আলো করে।
রশীদ হায়দারকে বা রশীদ হায়দারের প্রতিভাকে একটি ফ্রেমে আটকে রাখা যায় না। তিনি গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, শিশু সাহিত্য করেছেন, মঞ্চনাটক রচনা ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলা একাডেমিতে চাকরির সুবাদে তিনি সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলা একাডেমির নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার সম্পাদনা করেছেন অনেক দিন। তরুণ লেখকদের লেখা প্রকাশ করেছেন অনায়াসে। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হায়েনা ও দেশীয় রাজাকার আলবদরদের হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিকটজনদের রক্তাক্ত স্মৃতিভাষ্য ‘স্মৃতি ৭১’ গ্রন্থ খন্ডে খন্ডে সম্পাদনা করেছেন অসাধারণ মমতায়। সেই সব বেদনামথিত স্মৃতিভাষ্য আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘটনাবহুল জাদুঘর। পড়তে পড়তে চোখের পানি আটকে রাখা যায় না। দেশের নানা প্রান্তের শহীদ নিকটজনদের কাছ থেকে তিলে তিলে সংগ্রহ করে রশীদ হায়দার সাজিয়েছেন ‘স্মৃতি ৭১’ গ্রন্থ।
পাবনা থেকে ঢাকায় এসে পেশাজীবন শুরু করেন সিনে পত্রিকা চিত্রালীতে সাংবাদিকতার মাধ্যমে, ১৯৬১ সালে। চিত্রালীর পাশাপাশি পাকিস্তান রাইটার্স গিল্পের মুখপত্র ‘পরিক্রম’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন রশীদ হায়দার। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। বিচিত্র কাজ ও অগণন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও পরিচয়ের মধ্য দিয়ে মিষ্টভাষী রশীদ হায়দার নিজের পৃথিবী গড়ে তোলেন।
মজার ঘটনা রশীদ হায়দারের ভাইয়েরা জিয়া হায়দার, মাকিদ হায়দার, জাহিদ হায়দার ও আরিফ হায়দার কবি হিসেবে খ্যাতিমান হলেও, ব্যতিক্রম রশীদ হায়দার। তিনি নিজেকে নিবেদন করলেন কথাসাহিত্যের বিস্তৃত পটভূমিতে। প্রথম বই ‘নানকুর বোধি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। বইটি ছিল গল্পের। শুরুর পর আজন্ম মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ কথাশিল্পী রশীদ হায়দার বিচ্ছিন্ন থাকেননি, লেখার টেবিল থেকে, একমুুহূর্তের জন্য। পরের গল্পগ্রন্থ অন্তরে অন্য পুরুষ, মেঘেদের ঘরবাড়ি, গোলাপের জন্ম, তখন, আমার প্রেমের গল্প, পূর্বাপর, সীমা পরিসীমা, গন্তব্যে, সামান্য সঞ্চয়, যুদ্ধ ও জীবন, মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প, বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প, তিনি- একজনই এবং ছবি অপরূপ। ১৫টি গল্পগ্রন্থের ১২২টি গল্প লিখেছেন রশীদ হায়দার। প্রতিটি গল্পের মধ্যে বাংলাদেশের বিচিত্র রূপ-রস প্রকৃতি অঙ্কন করেছেন, বিপরীতে গল্পের আখ্যানে মানুষের বিচিত্র লোভ-লালসার নিখুঁত ছবিও এঁকেছেন, বাস্তবানুগ ঐশ্বর্যে।
রশীদ হায়দারের মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প বইয়ের প্রথম গল্প ‘এ কোন ঠিকানা’ গল্পটার ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, তিনি কত গভীর দৃষ্টির আয়তক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছেন। এই গল্পের প্রথম চরিত্র বাসেত। দ্বিতীয় চরিত্র নান্টু। দুজনার মধ্যে দেখা হয়েছে অনেক বছর পর। বাসেত একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের শহীদ মাজেদের ছোট ভাই।
গল্পের মধ্যেই আমাদের জানান দেন রশীদ হায়দার, কোনোভাবে পাকিস্তানি দালাল বা রাজাকার শব্দটা ব্যবহার না করেই, শিল্পের নিপুণ প্রকৌশলে জানিয়ে দেন নান্টু ছিল একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে রাজাকার কমান্ডার। আগে নান্টু আর মাজেদ ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নান্টু আর বাসেতের স্মৃতিমন্থনের লৌহকপাট ছিঁড়ে বের করে আনে আসল রূপ যখন নান্টু বলে, ‘বাসেত, বিশ্বাস করো বাসেত, মাজেদকে বাঁচানোর জন্য আমি তিন পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসেছি। আমি জানতাম, মেজরকে স্লিপ দিলেই মাজেদ ছাড়া পেয়ে যায়, কিন্তু যতবারই কাগজ-কলম হাতে নিয়েছি, মনে হয়েছে আমার পাকিস্তান আগে না বন্ধু আগে। তার চেয়ে বাসেত, তুমি তোমার বাসায় যাবার ঠিকানাটা বলো, আমি কথা দিয়েছি, তোমার ওখানে যাবো। থাক না, ওসব প্রসঙ্গ থাক এখন। দেশের খাতিরে বন্ধুকে হারালেও বন্ধুত্ব হারাইনি, তুমি তো সেই মাজেদের ভাই, কেনো তোমার বাসায় যাবো না?’
মাটির উৎসমুখ থেকে উঠে আসা কথাশিল্পী রশীদ হায়দার একেবারে খাঁটি রাজাকারের নিকৃষ্ট চরিত্র তুলে এনেছেন ‘এ কোন ঠিকানা’ গল্পে, একজন নান্টুর মধ্য দিয়ে হাজার হাজার লাখ লাখ নমরুদ রাজাকারের চরিত্র মানচিত্র। রাজাকার শ্রেষ্ঠ নেতা নান্টু সরাসরি বলছে, ‘আমার পাকিস্তান আগে না বন্ধু আগে!’
এবং স্বাধীনতার এত বছর পার হয়ে আসার পরও রাজাকাররা একই দৃশ্যে দুর্দান্ত অভিনয় করে যাচ্ছে। আমরা ধর্মীয় জজবায় দুই হাত তুলে নাচছি আর সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি। আমরাই আমাদের কবর রচনা করছি মহাসমারোহে। সেই ক্ষুদিত কবর দেখতেও পাচ্ছি, কিন্তু হুঁশে আসছি না। রশীদ হায়দার ‘এ কোন ঠিকানা’ গল্পের আখ্যানে প্রমাণ রেখে গেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, চিরকাল স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার। একাত্তরে বাঙালিদের হাতে নির্মমভাবে পরাজিত হওয়ার পরও, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে সব সুখ ও অধিকার ভোগ করে, বিশ্বাসঘাতকদের আত্মপ্রতারণার সূত্রে, বাংলাদেশেরই বিরোধিতা করে যাচ্ছে...নান্টু সেই সব নিকমহারাম চরিত্রের সামান্য একজন। সেই কুচক্রী ঘৃণিত চরিত্র গল্পের আখ্যানে তুলে ধরেছেন বাংলা কথাসাহিত্যের অসামান্য কথাকার রশীদ হায়দার।
অনেক স্মৃতির মধ্য দিয়ে যায় নান্টু আর একাত্তরের শহীদ মাজেদের ছোট ভাই। বাসেত একে একে জানায় একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে এই নান্টুর হাতে কত বাঙালি শহীদ হয়েছে, সেই নৃশংস হত্যার নিখুঁত নিপুণ বর্ণনা। বর্ণনা শোনে নান্টু আর ভেতরে-ভেতরে মুষড়ে পড়ে টেকির মুশালে নিচে ধানের তুষ কুঁড়ার অবশিষ্টাংশের মতো। এই গল্পে রশীদ হায়দার ভিন্ন নতুন একটা পরিপ্রেক্ষিতের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হওয়াদের কবর থেকে সুঘ্রাণ আসে....।
‘এ কোন ঠিকানা’ গল্পের এক জায়গায় এসে বাসেত বলে, বাবুলের মুখে সামান্য হাসি ফোটে! সেই হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে যায় দিকদিগন্ত, আর তাতেই স্পষ্ট দেখলাম মিলিটারিরা জিপের পেছনে দড়িতে বেঁধে বাবুলকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। নান্টু ভাই, বাবুলদের বাড়িটা ওখান থেকে মাইলখানেক হবে। ওই ওসমান গনির ছেলে ফারুকই সংবাদ দিয়েছিল বাবুল গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে এসেছে, আর সেই রাতেই ওকে ধরে হাত-পা বেঁধে জিপের পেছনে টানতে টানতে নিয়ে আসে। যেখানে বাবুলের মৃত্যু হলো, সুগন্ধিটা সেখান থেকেই শুরু...’
মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে, গল্পের অনুভূতির গভীরের পরিপ্রেক্ষিতে রশীদ হায়দারের মুক্তিযুদ্ধের গল্পে শহীদদের কবর থেকে বা শহীদ হওয়ার স্থান থেকে সুঘ্রাণ আসে! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্য ইতিহাসে বিস্ময়কর এক উপাধান যুক্ত করেছেন, রশীদ হায়দার। এ গল্পটি যদি আমি রশীদ ভাইয়ের জীবিতকালে পড়তাম, আমি রশীদ হায়দারের পায়ের ধুলো নিয়ে বলতাম, ‘আপনার চেয়ে বড় অনুভূতির মুক্তিযোদ্ধা আর নেই রশীদ ভাই।’
রশীদ হায়দারের উপন্যাস খাঁচায়, নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য, অন্ধ কথামালা, সাধ আহ্লাদ, অসম বৃক্ষ, মাবুহাই, পুনর্জন্ম, শোভনের স্বাধীনতা, নিয়মের নিয়ামত বুড়ো, জসিমের নকশিকাঁথা, যদি দেখা পাও। নাটকও লিখেছেন রশীদ হায়দারতৈল সংকট, গোলাপ-গোলাপ, শেক্্সপিয়ার দ্য সেকেন্ড।
অসহযোগ আন্দোলন : একাত্তর, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনদুটি বই সম্পাদনা করেছেন। ‘এবেলা ওবেলা’ বই বাংলাদেশে আদর্শ আত্মজীবনীর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আজন্ম বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংগ্রামে নিবেদিত কথাশিল্পী রশীদ হায়দার জেগে থাকবেন আমাদের হৃদ মন্দিরে।
