লোহার খাঁচার তৈরি আসামির কাঠগড়া আদালত থেকে তুলে নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ টেলিকমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সোমবার ঢাকার জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে খাঁচার ভেতরে আমাদের ঢোকায়নি। খাঁচার বিষয়টি আমি বারবার বলতে থাকব, কারণ এটা জাতির প্রতি মস্ত বড় অপমান। এই অপমান আমাদের সহ্য করা উচিত না। আমি বিচার বিভাগের প্রতি আবেদন জানাই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই খাঁচাগুলো সরিয়ে ফেলা হোক।’
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটির বিচার ‘দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে’ বলে অভিযোগ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়গুলোর (আনীত অভিযোগ) কোনো ভিত্তি নেই। এটা ভিত্তি ছাড়া একটা মামলা, সেটা তাড়াহুড়ো করে শেষ করে ফেলাটাই মনে হচ্ছে তাদের একটা বিষয়।’ এ সময় ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেছেন ড. ইউনূস।
গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের (মানি লন্ডারিং) অভিযোগে করা মামলার শুনানিতে অংশ নিতে গতকাল আদালতে যান ড. ইউনূস। এ দিন তিনিসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক রবিউল আলম সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ পিছিয়ে দেন। আগামী ৫ আগস্ট শুনানির পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে।
আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, ‘তারিখ নিয়ে যে রকম ধস্তাধস্তি করতে হলো, মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবে একটা বিষয় ভালো লাগল যে, আজকে খাঁচার ভেতরে আমাদের ঢোকায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘খাঁচার বিষয়টি আমি বারবার বলতে থাকব, কারণ এটা জাতির প্রতি মস্ত বড় অপমান। এই অপমান আমাদের সহ্য করা উচিত না। আমি বিচার বিভাগের প্রতি আবেদন জানাই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই খাঁচাগুলো সরিয়ে ফেলা হোক। এর ব্যবহার থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই। এটা মানবতার প্রতি অপমান। মানুষকে পশুর মতো খাঁচায় ভরে রাখবে কেন? এটা কোনো বিচারের বিষয় না, এটা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া উচিত। কারও জন্যই রাখা উচিত না। এটা রাখা মানে অপমান করা। বিচারের জন্য এসেছি। অপমানের জন্য তো আসি নাই।’
এক প্রশ্নে ড. ইউনূস অভিযোগ করেন, ‘আদালতে উপস্থিত যে কারও মনে হবে যে তাৎক্ষণিকভাবে বিচার শেষ করার একটা চেষ্টা আছে, এটা যে কারও মনে হবে। সেটা নিয়ে একটা সন্দেহ প্রকাশ করছি।’ কেন এমন মনে হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়গুলোর (আনীত অভিযোগ) কোনো ভিত্তি নেই। এটা ভিত্তি ছাড়া একটা মামলা, সেটা তাড়াহুড়ো করে শেষ করে ফেলাটাই মনে হচ্ছে তাদের একটা বিষয়।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, ‘কিছু একটার শিকার হচ্ছি তো, এটা তো পরিষ্কার। এটা প্রতিহিংসা বলেন, হিংসা বলেন, বিদ্বেষ বলেন সবকিছু মিলিয়েই।’ ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি যে, পাচ্ছি না। এটার (মামলা) ব্যাকগ্রাউন্ডে কী আছে, কীভাবে আছে, দেশের মানুষ সবাই বোঝে, তারা বোঝে নেবেন।’
এর আগে গত ১২ জুন ড. ইউনূসসহ অন্য আসামিদের উপস্থিতিতে একই আদালত এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে ১৫ জুলাই (গতকাল) বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল ড. ইউনূসসহ অন্য আসামিরা হাজিরা দেন। গতকাল তার আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন আদালতকে বলেন, এ মামলার কার্যক্রম বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছে। আগামী ২১ জুলাই আদেশ হবে। যে কারণে সাক্ষ্যগ্রহণে নতুন তারিখ ধার্যের আবেদন জানান তিনি। শুনানি নিয়ে আদালত মামলার পরবর্তী তারিখ ঠিক করে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।
শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ড. ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ছয় মাসের কারাদ- ও অর্থদ- দেয় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। এ মামলায় তারা জামিনে আছেন। রায়ের বিরুদ্ধে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে করা আপিল বিচারাধীন।
গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ সালের ৩০ মে ড. ইউনূসসহ প্রতিষ্ঠানটির ১২ জনের নামে মামলা করে দুদক। গত ২৯ জানুয়ারি ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলার অন্য আসামিরা হলেন গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক এমডি মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম, এসএম হুজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, আইনজীবী মো. ইউসুফ আলী, জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, ইউনিয়নের প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম ও দপ্তর সম্পাদক মো. কামরুল হাসান। এ মামলায় গত ৩ মার্চ আত্মসমর্পণ করে জামিন পান ড. ইউনূস।
