কোটা সংস্কার ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এখন ছাত্রলীগ ও শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। গত দুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে ক্যাম্পাসগুলো ছিল কার্যত রণক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বহিরাগত ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সংগঠনটিরই অনেক নেতাকর্মী। ঢাবিসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে পড়েছে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের হিড়িক। ইতিমধ্যে শতাধিক নেতাকর্মী পদত্যাগ করার ঘটনা সামনে এসেছে।
এ ছাড়া ছাত্রলীগের যেসব নেতাকর্মী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছেন, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাবি, কুবি,চবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিভাগের গ্রুপ থেকে হামলাকারী এবং হামলায় সহযোগিতাকারীদের বিতাড়িত করতে দেখা যায়। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের তিনটি হলকে ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করেছেন আন্দোলনকারীরা। বহিরাগত টোকাই শ্রেণির ছাত্রলীগের কর্মীদের এনে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার প্রতিবাদে এই পদত্যাগ বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অনেকে।
রবিবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের পর থেকে এই পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে। ওইদিন রাতেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রলীগ নেতা। পরে গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত যুবকদের এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ করেন আরও অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদ জানিয়েও পদত্যাগের ঘোষণা দেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি নুরুল ইসলাম হৃদয়, একই অনুষদের উপসম্পাদক জেবা সায়ীমা, সার্জেন্ট জহরুল হক হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি ওয়াসিক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি হাসিবুল হাসান হাসিব, শামসুন নাহার হল ছাত্রলীগের উপপাঠাগার সম্পাদক ইসরাত জাহান সুমনা, বিজয় একাত্তর হল শাখার গ্রন্থনা ও প্রকাশনা উপসম্পাদক শাহ সাকিব সাদমান প্রান্ত, বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলের অর্থ সম্পাদক জুয়েনা আলম মুন, নাট্য ও সাহিত্য সম্পাদক মেহেরুন্নিসা মিম, একই হলের আইন সম্পাদক সিরাজাম মনিরা তিশা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ শাখার গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন সম্পাদক মাছুম শাহরিয়ার, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট শাখার মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক উপসম্পাদক রাতুল আহামেদ ওরফে শ্রাবণ এবং আইন অনুষদ শাখার গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক আশিকুর রহমান ওরফে জিমসহ বিভিন্ন হল এবং অনুষদের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের প্রায় সবাই নিজ নিজ ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া পোস্টে পদত্যাগের কথা জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত হল এবং নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানা যায়। এরই মধ্যে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের ১৬তম ব্যাচের সব ছাত্রী একযোগে ছাত্রলীগ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।
এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের অনেক নেতাকর্মী পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
তাদের মধ্যে শেখ রাসেল হল শাখা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ সামি, শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ইমরান আহমেদ, শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আফরিন আলম রিমি, খাদিজা জুঁই, সিদরাতুল মুনতাহা (নবাব ফয়জুন্নেছা হল সেক্রেটারি), রিপনুল ইসলাম রবিন প্রমুখ রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের সহসভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করা শিপন মাহমুদ ফেসবুকে লেখেন, ‘আমি চলমান ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান করছি। ন্যায়ের পক্ষে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শোকজ খাওয়া এবং মুচলেকার মুখে পড়া ছাত্র আমি। আমি আজীবন নজরুল। প্রতিবাদ আমার রক্তে। আমি আজন্ম প্রতিবাদী পুরুষ। আমি মো. শিপন মিয়া, সহসভাপতি, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চলমান যৌক্তিক ছাত্র আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রদান করে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিজয় একাত্তর হলের সহসভাপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলাম। অন্যায় আর শিপন এক লাইনে থাকে না।’
বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের অর্থ সম্পাদক জুয়েনা আলম মুন বলেন, ‘ছাত্রলীগকে ন্যায়ের কা-ারি ভেবে ছাত্রলীগ করতাম। কিন্তু এখন এই সংগঠনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা ছিল, এটাও মনে করলে আমার রক্তাক্ত বন্ধু-বান্ধবী, সিনিয়র-জুনিয়রদের চেহারা মনে পড়বে। তাই স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে পদত্যাগ করছি।
একদিকে পদত্যাগের হিড়িক, অন্যদিকে ত্যাগী নেতাদের চলছে পরীক্ষা।’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপে নেতারা লিখছেন, এখন আপনাদের পরীক্ষার সময়। এখনকার অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে আপনাদের পদপদবি।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রলীগে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী রাহাত ইসলাম বলেন, যারা এই ক্রান্তিলগ্নে পদত্যাগ করছেন, তারা আসলে ছাত্রলীগের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী। তারা এত দিন ছাত্রলীগের এই পদপদবিকে হলে শান্তিতে থাকার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।
নেতাকর্মীদের পদত্যাগ ইস্যুতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
তিনি জানিয়েছেন, তারা যাচাই-বাছাই করছেন। এটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এর বেশি কিছু বলতে চাননি ছাত্রলীগ সভাপতি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের তিনটি হলকে ছাত্রলীগমুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল এবং অমর একুশে হলে শিক্ষার্থীদের একক আধিপত্য দেখা গেছে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কয়েকটি রুমও ভাঙচুর করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে মারধর করেছেন শিক্ষার্থীরা।
ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী মোয়াজ্জেম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের হামলার কারণে আমরা ছাত্রলীগকে বয়কট করেছি। এই তিনটি হলে ছাত্রলীগ বলতে কিছু নেই, সবাই সাধারণ শিক্ষার্থী। এখন থেকে বৈধভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে থাকবেন, কারও দাসত্ব আর নয়।’
