নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের মধ্যে ১৩৬ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে জেলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে তারা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এ ঘটনায় নরসিংদী জেলা কারাগারের জেল সুপার ও জেলারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কারা অধিদপ্তর। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নরসিংদী জেলা কারাগার পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, দেশে চিরুনি অভিযান চলছে। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরলেই কারফিউ তুলে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে আমাদের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া হত্যা মামলার এক আসামি আবদুল আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের একদল পুলিশ আঠারবাড়ী ইউনিয়নের বৈরাটি গ্রাম থেকে গতকাল সকালে তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, নরসিংদী কারাগারে দুর্বৃত্তদের হামলার পর কারাগার থেকে পালিয়ে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিল আবদুল আলী।
গতকাল দুপুরে নরসিংদী কারাগার পরিদর্শনে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দুর্বৃত্তদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কারাগার, জেলা পরিষদ ও ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশ থানা পরিদর্শন করেন। পরে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্র্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সভা করেন। মন্ত্রী এ সময় বলেন, নরসিংদী কারাগারে যেসব জঙ্গি ছিল তাদেরও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরকার ও জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার। তারা দেশকে বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের বাধা সৃষ্টি করার জন্যই এসব করেছে। এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
এ সময় নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতীক) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মশিউর রহমান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএসএম আনিসুল হক, অতিরিক্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক শাহাবুদ্দিন খাঁন ও ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি নুরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ড. বদিউল আলম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
দেশে চলমান সহিংসতার মধ্যে দুর্বৃত্তরা শুক্রবার বিকেলে নরসিংদী জেলা কারাগারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র ও গুলি লুট করে ৮৩৬ আসামি ছেড়ে দেয়। এরই মধ্যে সোমবার জেলা প্রশাসন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া সব কারাবন্দিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েদিরা আইনজীবীদের মাধ্যমে কারাগারে আত্মসমর্পণ করেন।
এ উপলক্ষে জেলা আইনজীবী সমিতিতে উপস্থিত কয়েদিরা জানান, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কারাগার থেকে পালাননি। হামলাকারীরা জোর করে তাদের কারাগার থেকে বের করে দেয়। তাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তারা আত্মসমর্পণ করেছেন।
হত্যা মামলার আসামি রায়পুরার বায়োজিদ বলেন, ‘আমি একটি মামলায় ২০ মাস ধরে কারাবন্দি আছি। আমার বিশ্বাস আমি একদিন মিথ্যা মামলা থেকে খালাস পাব। তাই আইনের প্রতি সম্মান রেখে আমি আত্মসমর্পণ করতে এসেছি।’
সতিনের সন্তানকে হত্যার দায়ে কারাভোগ করছেন রিংকু সাদিয়া। তিনি বলেন, ‘ওইদিন হামলাকারীরা কারাগারে সব পুরুষ কয়েদিকে ছেড়ে দেওয়ার পর সর্বশেষ মহিলা ওয়ার্ডে হামলা চালায়। আমাদের জোর করে কারাগার থেকে বের করে দেয়। এখন শুনছি যারা আত্মসমর্পণ করবে না তাদের নতুন করে আরও মামলার আসামি করা হবে। তাই আমরা আত্মসমর্পণ করতে এসেছি।’
নরসিংদী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী নাজমুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর অনেক কারাবন্দি আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি আত্মসমর্পণ করতে উৎসাহিত করেন। এরই মধ্যে গত দুদিনে ১৩৬ কয়েদি আত্মসমর্পণ করেছেন। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছি।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক ড. বদিউল আলম জানান, কারাগারে হামলা, অস্ত্র ও গুলি লুট করে কয়েদি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কারা অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারা জড়িত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও গাফিলতি রয়েছে কি না, তা বেরিয়ে আসবে। এ ঘটনায় কারা অধিদপ্তর নরসিংদী জেলা কারাগারের জেল সুপার ও জেলারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
