অলিম্পিকে আপনার লক্ষ্য কী? প্রশ্নটা শুনেই প্রত্যয়ী কণ্ঠের খোঁজ মিলল ফোনের ওপাশে। সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে ইমরানুর রহমান বলে উঠলেন, ‘আমি চাই পরের রাউন্ডে যেতে, কিংবা যদি সম্ভব হয় তারও চেয়ে বেশি কিছু করতে। এমন কিছুই করতে চাই, যা আগে কেউ করতে পারেনি।’
বাংলাদেশের হয়ে চার বছরের ক্যারিয়ারে কমনওয়েলথ ও এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরের ট্র্যাকে দৌড়ানো হয়ে গেছে ইমরানুরের। এবার আসল মঞ্চ অলিম্পিকে নিজেকে প্রমাণের পালা। ৩ আগস্ট প্যারিসের ট্র্যাকে ইমরানুর নামবেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে। ১০০ মিটারে প্রথম ধাপ পেরিয়ে পরের ধাপে যাওয়ার লক্ষ্য টানা চারবারের দ্রুততম মানবের।
চার দশকের অলিম্পিক যাত্রায় প্রতিবারই ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের স্প্রিন্টাররা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে প্রত্যেককেই প্রথম হিট কিংবা প্রিলিমিনারি রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। মুহূর্তের সেই দৌড়ের আগে-পরে শহর ভ্রমণ, সুন্দর সুন্দর ক্রীড়া স্থাপনা দর্শন আর অভিজ্ঞতা অর্জনেই সীমাবদ্ধ ছিল বাংলাদেশের দৌড়বিদদের অলিম্পিক। ইমরান অগ্রজদের দেখানো পথে হাঁটতে চান না।
বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকস জগতে আবির্ভাবের পর থেকেই ১০০ মিটারের সব রেকর্ড নিজের করে নেওয়া এবং বারবার নিজেকেই পেছনে ফেলা ইমরানুর অবশ্য ৬০ মিটারে বেশি স্বচ্ছন্দ। ২০২৩ সালে কাজাখস্তানে এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে সবাইকে ছাড়িয়ে সেরা হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, হয়েছিলেন ইনডোর গেমসে এশিয়ার দ্রুততম মানব। এরপর থেকে তাকে ঘিরে স্বপ্ন এগিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। তার পেছনে বাড়ানো হয়েছে বিনিয়োগ। যদিও গত বছর এশিয়ান গেমসে নিজেকে চেনাতে পারেননি। সে বছর যুক্তরাজ্যে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস অনুমোদিত এক প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটারে ১০.১১তে দৌড়ে গড়েন নয়া জাতীয় রেকর্ড; যা তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এশিয়াডে ভালো করার। সেটা হয়নি। তবে অলিম্পিকে যাচ্ছেন নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে।
নিজেকে নতুনভাবে চেনানোর মিশনে যুক্তরাজ্যেই নিজস্ব ট্রেইনার অ্যাডওয়ার্ড স্টিভফগের অধীনে প্রস্তুতি নিয়েছেন ইমরানুর। সেখান থেকে ২৪ জুলাই ট্রেইনার ও ফিজিও আলীকে নিয়ে প্যারিসে যাবেন। বাংলাদেশ বহরে যুক্ত হয়ে দুদিন পর উদ্বোধনীর মার্চপাস্টেও থাকবেন। প্যারিসের জল-হাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ইমরানুরের জন্য কঠিন নয়। যুক্তরাজ্যের পাশে বলেই তাকে সেরারূপে দেখার প্রত্যাশাটা বাড়াবাড়ি নয়। ইমরানুরও ভালো করতে মুখিয়ে আছেন। এখনো দশের নিচে না দৌড়াতে পারা নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই ইমরানুরের। তবে প্যারিসে নিজের সেরাটাই দিতে চান, ‘আমি সেখানে চেষ্টা করব নিজের সেরাটা দিতে। নিজের সামর্থ্যে যতটুকু কুলাবে, ততটুকুই করতে চাইব। দেখা যাক এরপর কী হয়। সবাই শুধু রেকর্ডের কথা বলে। তবে আমার মনে হয় কোনো অ্যাথলেটই শুধু রেকর্ডের কথা ভেবে দৌড়ায় না।’
ইমরানুরকে নিয়ে পদকের স্বপ্ন দেখা এক অসম্ভব কল্পনা। প্রিলিমিনারি পর্ব পেরোতে পারলেই অনেক। তবে বাংলাদেশিদের সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে এই স্প্রিন্টার মনে করেন আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকাটা ভীষণ জরুরি। অর্থ উপার্জনের ভাবনাটা না থাকলে তিনি মনে করেন যে খেলার খেলোয়াড়রা শুধু তাদের খেলাতেই শতভাগ মনোযোগ দিতে পারবে, ‘আমি শতভাগ বিশ^াস করি অর্থের চিন্তাটা না থাকলে প্রত্যেকেই ট্রেনিং ও পারফরম্যান্সে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারবে। সাফল্য পেতে হলে আপনার এটা লাগবেই। আপনি সেই স্বস্তিটা না পেলে প্রতিদিনই ভুগতে থাকবেন। এটা কেবল অ্যাথলেটিকস নয়, প্রতিটি খেলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’ এরপর যোগ করেন, ‘অলিম্পিকে ভালো করতে হলে আপনার উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ সুবিধা পেতে হবে। পাশাপাশি নিজের শতভাগ চেষ্টা ও মনোযোগ থাকতে হবে। সব ভুলে অ্যাথলেটিকস নিয়েই পড়ে থাকতে হবে। খাওয়া, ঘুমানো, বেঁচে থাকা আর ট্রেনিং- যারাই বড় মঞ্চে পদক পায়, তাদের রুটিনটা ঠিক এটাই।’
এশিয়ান ইনডোরের শ্রেষ্ঠত্ব এ বছর ধরে রাখতে পারেননি ইমরানুর। সার্বিক উন্নতির গ্রাফ কিছুটা নিম্নমুখী। ইমরানুর অবশ্য এটা মানতে চাইলেন না, ‘দেখুন, উন্নতি উন্নতিই। এটা কম হোক আর বেশি। প্রতিবছর আমি দেশের দ্রুততম মানব হচ্ছি এবং প্রতিবারই নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছি। এটা কিন্তু আগে কেউ করতে পারেনি। এই যে আমার ভালো করায় দেশের অ্যাথলেটিকস নিয়ে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।’
১০০ মিটারকে বলা হয় একটা গেমসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। এ কারণেই দুনিয়ার প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিত্ব থাকে এই ইভেন্টে। সুতরাং বাংলাদেশি কারও এখানে খুব বেশি ভালো করে ফেলার সম্ভাবনা বলতে গেলে শূন্য শতাংশ। এর মধ্যেই ইমরানুর যদি প্রিলিমিনারি রাউন্ড পেরিয়ে পরের রাউন্ডে যেতে পারেন, সেটাকেই ধরে নিতে হবে বড় সাফল্য হিসেবে।
ইতিহাস গড়তে প্যারিসের পথে সাগর
একটা ‘প্রথমে’ চোখ রবিউলের
নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চান সোনিয়া
থাইল্যান্ডে গিয়ে বদলে গেছেন সামিউল