প্যারিসগামীদের লক্ষ্য

একটা ‘প্রথমে’ চোখ রবিউলের

অলিম্পিকে আমাকে ঘিরে পদকের কোনো প্রত্যাশা নেই। তাতে আমার নির্ভার থাকারই কথা। তবে সেটা সম্ভব নয়, কারণ নিজের সেরাটা যদি সেরা মঞ্চে দিতে না পারি তবে তো নিজের কাছেই হেরে যাব

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৫:০২ পিএম

আরেকটি অলিম্পিক যখন কড়া নাড়ছে, তখন আলোচনায় উঠে এসেছে শুটিং। প্যারিস অলিম্পিকে এবার রাইফেল হাতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন রবিউল ইসলাম। পাবনার এই তরুণকে ঘিরে শুটিং অঙ্গনের মানুষের যত আশা। সদ্যপ্রয়াত আতিকুর রহমান ও তার সতীর্থ আব্দুর সাত্তার নিনির হাত ধরে ১৯৯০ সালে প্রথম কমনওয়েলথ গেমস স্বর্ণপদক জিতেছিল বাংলাদেশ। অগ্রজের সেই প্রথমের মতো রবিউলও চান একটা প্রথমের জন্ম দিতে। গেল দুই বছরের পারফরম্যান্সের নিরিখে রবিউল স্বপ্ন দেখছেন সেরা আটে নাম লিখানোর, যেটা অতীতে দেশের আর কোনো শুটার অলিম্পিকের মঞ্চে পারেননি।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে শুটিং যেন পরিবারের বড় ছেলে। আর যাই হোক, পরিবারের বড় ছেলেকে স্বার্থপর হওয়া চলবে না। নীরবে পরিবারের জন্য নিজের পুরোটা নিংড়ে দিতে হবে। বিপরীতে মিলবে না কোনো কিছুই। শুটিংয়ের অবস্থা বলতে গেলে তাই। যুগে যুগে এই খেলাটা দিয়ে বারবার বাংলাদেশকে চিনেছে গোটা বিশ্ব। সেই ১৯৯০ সালে আতিক-নিনি জুটিতে সাফল্যের দরজা খোলে। অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে পুরুষ পিস্তল ডাবলসে সোনার হাসি হাসেন তারা। এরপর ২০০২ ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে সোনা জেতেন আসিফ হোসেন খান। ২০১৪ ও ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমসে রুপার হাসি হাসেন আব্দুল্লাহ হেল বাকী। ২০১৮ সালে পিস্তল শুটার শাকিল আহমেদও জিতে নেন রুপা।

এই চার দশকে সাফ গেমস, পরবর্তী সময়ে এসএ গেমসেও পদক এসেছে নিয়মিত। তারপরও ক্রীড়াঙ্গনের কর্তারা শুটিংকে আলাদা করে দেখেননি কখনো। খেলাটা পায়নি সঠিক পরিচর্যা। ফলে অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও এ দেশের শুটাররা সাফল্য পাননি এশিয়ান গেমস ও অলিম্পিকের মতো আসরে।

রবিউলও যে এবার অধরা সাফল্য ধরে ফেলবেন, সেটা জোর গলায় বলা যাচ্ছে না। আসলে তাকে ঘিরে অলিম্পিক ভাবনাটাই ছিল না অনেকের। তার অলিম্পিকযাত্রা অনেকটাই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যপার। কোটা প্লেস অর্জনের সুযোগগুলো বারবার হাতছাড়া হওয়ার পর বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশন ওয়াইল্ড কার্ডের জন্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে নারী রাইফেল শুটার শায়রা আরেফিনের নাম প্রথম পছন্দ হিসেবে পাঠিয়েছিল। দুইয়ে ছিল রবিউলের নাম। তবে গেল দুই বছরে তিনটি কোটা প্লেস টুর্নামেন্টে রবিউলের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখে আইওসি শায়রার জায়গায় ওয়াইল্ড কার্ডের জন্য মনোনীত করে রবিউলকে।

গেল জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ায় কোটা প্লেস আসরে অল্পের জন্য স্বপ্ন পূরণ হয়নি রবিউলের। মাত্র দশমিক ৩ পয়েন্টের জন্য সেরা আটে নাম লিখাতে পারেননি তিনি। সেটা অনেক বড় আক্ষেপ ছিল তার জন্য। ক্যারিয়ার সেরা ৬২৮ স্কোর গড়েও সেরা আটে যেতে না পারায় নিজ যোগ্যতায় অলিম্পিকে খেলার সুযোগ ভেস্তে যায় তার। এরপর খানিকটা হতাশার মধ্যেই কেটেছে ২৪ বছরের রবিউলের। কারণ ওয়াইল্ড কার্ড পাওয়া নিয়েও ছিলেন দোলাচলে, ‘কোটা প্লেসের সুযোগ যখন হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ খুব কাছাকাছি গিয়েও পারিনি। এরপরই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। সামনের অলিম্পিকে যাতে সরাসরি খেলতে পারি, সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করব এই সংকল্প করি। এরপর ওয়াইল্ড কার্ডের প্রশ্নে আমি ছিলাম দ্বিতীয় পছন্দ। শায়রার নাম ছিল এতে। পরে অবশ্য কোটা প্লেস আসরে পারফরম্যান্স বিবেচনা করে ওআইসি আমাকে ওয়াইল্ড কার্ড দেয়।’ 

ওয়াইল্ড কার্ডের সৌজন্যে ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশের শুটাররা অলিম্পিকে অংশ নিয়ে আসছেন। সেবার বার্সেলোনা অলিম্পিকে অংশ নেন কাজী শাহানা পারভীন। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নারী অলিম্পিয়ান। এরপর ১৯৯৬ সালে সাইফুল আলম রিংকি, ২০০০ সালে সাবরিনা সুলতানা, ২০০৪ সালে আসিফ হোসেন খান, ২০০৮ সালে ইমাম হোসেন ও ২০১২ সালে অংশ নেন শারমিন আক্তার রত্না। সর্বশেষ ২০১৬ রিও গেমস ও ২০২১ টোকিও গেমসে প্রতিনিধিত্ব করেন আবদুল্লাহ হেল বাকী। আগের সাত অগ্রজের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রবিউল যাচ্ছেন প্যারিসে নিজের প্রমাণ দিতে। সেটা পারবেন বলেই বিশ্বাস রবিউলের, ‘আমার সর্বোচ্চ ৬২৮। তবে সর্বশেষ প্রস্তুতিমূলক আসরে ৬৩০.২ স্কোর গড়েছি। এই স্কোরটা যদি করতে পারি তবে সেরা আটে যাওয়া সম্ভব। যদিও প্র্যাকটিসের পারফরম্যান্স বড় মঞ্চে ধরে রাখা চ্যালেঞ্জের।’

ইরানি কোচ জায়ের রেজাইয়ের অধীনে অলিম্পিকের প্রস্তুতি রবিউল নিচ্ছেন মাত্র একমাস ধরে। তবে এই কোচের অধীনে নিজেকে পরিণত করছেন গেল দুই বছর ধরে। ২০১৯ সালে প্রথম সিনিয়র জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া বিকেএসপির সাবেক এই শুটার অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে সেরা রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। কথাবার্তায় দারুণ সংযত রবিউল বলেন, ‘অলিম্পিকে আমাকে ঘিরে পদকের কোনো প্রত্যাশা নেই। তাতে আমার নির্ভার থাকারই কথা। তবে সেটা সম্ভব নয়, কারণ নিজের সেরাটা যদি সেরা মঞ্চে দিতে না পারি তবে তো নিজের কাছেই হেরে যাব।’ 

অন্তত নিজের কাছে রাবিউলরা না হারুক, এটাই প্রত্যাশা।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত