লাল পাহাড়ের গুহা

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৪, ১২:৫৯ এএম

শিবুকান্তি দাশ একটা ছায়া। ছায়াটা মানুষের মনে হয়। কিন্তু মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না। অনেক দূর থেকে দেখছে বলে হয়তো মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না। ওরা যাবে লাল পাহাড়ের গুহায়। পথে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। তখন দেখল মানুষের ছায়ার মতো একটা অবয়ব আসছে এ দিকেই।

ওরা মিন্টু আর গিট্টু। দুই বন্ধু। তারা বেড়াতে গিয়েছে মিন্টুর মামার বাড়িতে। গিট্টু হচ্ছে মিন্টুর বাল্যবন্ধু। দুজনের পাশাপাশি বাড়ি। একই স্কুলে পড়ে। ওরা বেরিয়েছিল দুপুরের খাবার খেয়ে। ওদের ছোট মামা বারণ করেছিল বের না হতে। বিকেলে একসঙ্গে বের হবে বলে। ওরা কথা শোনেনি। মামাকে বাদ দিয়ে নিজেরাই বের হয়েছে। ওরা প্রথমে বাজারে গিয়েছিল। বাজার থেকে ওদের প্রয়োজনীয় টুকটাক জিনিসপত্র কিনেছে। ওদের যে কখন কী লাগে বলা মুশকিল!

দুই বন্ধু প্ল্যান করে মামাবাড়ি গিয়েছে। সেখানে লাল পাহাড়ে একটা গুহা রয়েছে। সেটা অনেক আগের কথা। দুস্যরা নাকি সে সময় লুটপাট করে মানুষের সোনাদানা টাকাপয়সা দামি জিনিসপত্র লুট করে লাল পাহাড়ের গুহায় রেখে দিত।

লাল পাহাড়ের পাদদেশে ছোট একটি গ্রাম। সেই গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু বাড়িঘর। তার মধ্যে মিন্টুর মামাদের বাড়িও। মাটির গুদাম ঘর। টিনের ছাউনি। বর্ষাকালে টিনের চালে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দে মন নেচে ওঠে।

মিন্টু আর গিট্টু বাজার থেকে বেরিয়ে অনেক দূর হেঁটেছে। পাহাড়ের গোড়ায় একটা বিশাল বটগাছ। গাছের নিচে এলাকার লোকজন ছায়ার জন্য দিনের বেলায় জড়ো হয়। গল্পগুজব কত কথা হয়।

মিন্টু বলল, গিট্টু বটগাছের নিচে একটু জিরিয়ে নিই। ক্লান্ত লাগছে।

‘আরে, একটু পর সন্ধ্যা হয়ে গেলে গুহায় ঢুকব কী করে! আর ওখানে দিনের বেলায় কেউ যায় না। আমরা অন্ধকারে কী...’

গিট্টুর কথাটা শেষ করার আগেই মিন্টু বলল, আরে আমরা কি বেড়াতে যাচ্ছি নাকি! অন্ধকারে গেলেই তো আমরা সাকসেস।

‘আরে, আমাদের সঙ্গে কি আলো আছে যে, অন্ধকারে গুহায় পথ দেখব?’

মিন্টু এক গাল হেসে গিট্টুকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে টর্চলাইটটা দেখিয়ে বলল, তুই খেয়াল করিসনি দোকান থেকে এটা কিনলাম।

গিট্টু আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বটগাছের মোটা এক শিকড়ে ধপাস করে বসে পড়ল। এ সময় সেখানে দুজন লোক বসা ছিল। তারা মাঠে কৃষিকাজ করছিল। জিরিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াবে। ওরা দুজনকে এলাকায় নতুন দেখে জানতে চাইল, কোথায় যাবে তারা।

মিন্টু বলল, ‘আমরা গুহা দেখতে আসছি।’

‘গুহা? ওরে বাবা। এখন সন্ধ্যা হয়ে আসবে। তোমরা এ সময় গুহা দেখতে যাবে মানে কী? ভূতের খাবার হওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি? ডাকাতের গুলির মুখেও পড়তে পার।’

গিট্টু ভয় পাওয়ার মতো ভঙ্গি করে তাদের বলল, ‘গুহায় কি ভূত থাকে? ডাকাত কারা?’

‘বাপরে বাপ! এ দেখি বিচ্ছু। ভূত, ডাকাত কোনো কিছু ভয় পায় না!’

‘কাকা, ওসব ভুয়া! এখন আর ভূত বা ডাকাত বলে কিছু নেই। পাহাড়ে কোনো লোকজনই নেই, ডাকাতি করবে কী? এখানকার মানুষজন খেটে খায়। তাদের কি টাকাপয়সা আছে! আর ভূত আসবে কোথা থেকে? আমরা ভূতের বাবা!’

মিন্টু-গিট্টুর কথা শুনে গ্রামের লোক দুজন ভড়কে গেল। ওরা মনে মনে বলছে, ওরে বাবা! এই বিচ্ছু দুটো কোত্থেকে যে এলো! মায়ের কোল খালি করে বাছারা যাবে ভূতের বাড়ি! খুব আফসোস করে ওরা ওদের বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

সূর্য তখন ডুবো ডুবো। চারদিকে কাকের পিঠের মতো কালো হয়ে আসছে পৃথিবী। চারদিক থেকে শেয়ালসহ নানা বুনো প্রাণীর ডাক ভেসে আসছে।

মিন্টু টর্চের আলো ফেলে গুহার দিকে পা বাড়ায়। পাশাপাশি গিট্টুও চলছে। দুজনের কারও মুখে কথা নেই। গুহার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওরা।

‘পকেট থেকে চাকুটা বের কর।’ গিট্টুকে বলল মিন্টু।

‘গ্যাস লাইটারটা কি তোর কাছে?’ মিন্টুকে জিজ্ঞেস করে গিট্টু।

‘সব আছে, সব আছে। কথা বলিস না। সামনের দিকে তাকা।’

‘কই, কিছু তো দেখছি না!’

‘তোর মুন্ডু।’

‘টর্চলাইটটা জ্বালা না!’

গিট্টু কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কপাট করে জোরে শব্দ তুলে কি যেন ঘটল। ওদের মনে হয়েছে কেউ ঘরের কাঠের দরজা বন্ধ করছে। শেয়ালের হুক্কা-হুয়া ডাকটা চারদিক থেকে ভেসে আসছে। ওরা একটুও ভয় না পেয়ে সামনের দিকে পা বাড়ায়। এমন সময় গুহার পাশের পাহাড়ের ছোট ছোট টিলাগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে কারা যেন বাজনা বাজাচ্ছে। নানা রকমের অট্টহাসিও ভেসে আসছে। গিট্টু এবার যেন ভয় পেল।

মিন্টু টর্চের আলো জ্বেলে দেখতে চাইল, কিছু দেখা যায় কিনা।

দেখে কী একটা বন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সারা গায়ে বড় বড় চোখ। মাথায় দুটো চোখ আগুনের মতো জ্বল জ্বল করছে। চারদিকে বাজনা বাজছে যেন নরহত্যা উৎসবের আয়োজন।

‘ওরে বাবা গো, মাগো’ বলে জোরে চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে গিট্টু মাটিতে পড়ে গেল।

কে যেন খুব ব্যঙ্গ করে মিন্টুকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বলল, গুহার ভেতর যাবি? হা হা হা! যমের বাড়ি যেতে না চাইলে দৌড়ে বাড়ি ফিরে যা, যা, যা...

ওদের ঘুম ভেঙে দেখে সকাল হয়ে গেছে। ছোট মামা বিল্লাল ওদের পাশে বসা। মামা হেসে হেসে বলল, লাল পাহাড়ের গুহা দেখতে যাবে নাকি?

লজ্জা পেয়ে হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে রাখে ওরা দুই বন্ধু।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত