প্যারিস অলিম্পিক ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। একের পর এক কাণ্ডে সমালোচিত হচ্ছেন আয়োজকরা। তবে এবার প্রতিযোগিতাটির সূত্র ধরে আবারও আলোচনায় ফ্রান্সের হিজাবনীতি। দেশটির আইন অনুযায়ী ফ্রান্সের কোনো কর্মকর্তা ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা হিজাব পরতে পারবেন নাÑ এক কথায় ফ্রান্সে হিজাব নিষিদ্ধ। তবে প্যারিস অলিম্পিকে অন্য দেশের অ্যাথলেটদের হিজাব পরার অনুমতি দিয়েছে ফ্রান্স। তবুও দেশটির বসবাসরত মুসলিম নারীদের কথা ভেবে মন কাঁদছে এক অস্ট্রেলিয়ান বক্সারের।
টিনা রাহিমি নামে এই বক্সার আবার অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন। কারণ দেশটির প্রথম মুসলিম নারী বক্সার হিসেবে অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছেন ২৭ বছর বয়সী টিনা। ২০২২ সালে কমনওয়েলথ গেমসে যিনি হিজাব নিয়ে ব্রোঞ্জ জিতে আলোচনায় এসেছিলেন। এবার প্যারিসের বক্সিংয়ের রিংয়ে নামার আগে আরও একবার আলোচনায় তিনি। হিজাব নিয়ে ফ্রান্সের নিয়মনীতি দেখে টিনা নাকি অবাক হয়েছেন।
টিনা ১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির সাউথ ওয়েস্টে জন্ম নিলেও তিনি মূলত একজন ইরানিয়ান। তার বাবা ছিলেন একজন কুস্তিগিরপ্রেমী। তাই কুস্তির টানে ১৭ বছর বয়সে মাতৃভূমি ছেড়ে সাগরপথে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়াতে। ১৯৮০-৯০ সালে তিনি ছিলেন অজিদের চ্যাম্পিয়ন রেস্টলার। যাকে দেখে মেয়েও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। শেষে তিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে গড়ে ফেললেন ইতিহাসই।
২০১৭ সালে বক্সিংয়ের শুরু টিনার। জিম করার সময় মজার ছলে এক বন্ধুর সঙ্গে করেছিলেন বক্সিং। শুরুটা সেখান থেকেই। শরীর কীভাবে ফিট রাখতে হয়, সেটা বাবার কাছ থেকেই জেনে নিয়েছিলেন ছোট বয়সে। স্বাস্থ্য সচেতন থাকায় অ্যাকাডেমিতে গিয়ে কৌশল আয়ত্ত করতে বেশি সময় লাগেনি তার। তাই তো ৫ বছরের মধ্যে যোগ্যতা অর্জন করেন কমনওয়েলথে খেলার। সেখানেই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম বক্সার হিসেবে তার ইতিহাস গড়ার শুরু। প্রথম আসরেই ফিদারওয়েট ক্যাটাগরিতে তিনি ব্রোঞ্জ নিয়ে যান বার্মিংহামের আসর থেকে। সেখানে তাকে হিজাব পরা অবস্থায় খেলতে দেখা গিয়েছিল।
হিজাব পরে খেলতে অস্বস্তি হয় কি না জানতে চাইলে একবার এক সাক্ষাৎকারে টিনা বলেছিলেন, ‘ও মাই গড! অনেক গরম এটা। বিশেষ করে সলোমন দ্বীপপুঞ্জে, আর্দ্রতা অনেক বেশি ছিল। মাথায় দিতেই আমার ঘাম ঝরছিল। তবে শৈশব থেকে এটি পরিধান করায় এখন এটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’
কমনওয়েলথে ব্রোঞ্জ জেতার আগেই নিজের হিজাব দিয়ে আলোচনায় আসা এই বক্সার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ প্যাসিফিক গেমসে ফিদারওয়েটেই জিতেন সোনা।
আর এবার অলিম্পিকে এসে তো আবার গড়লেন ইতিহাস। কারণ অস্ট্রেলিয়া থেকে কোনো মুসলিম নারী বক্সার খেলতে আসেননি অলিম্পিকে। এবার তিনি এসে নাম লেখালেন প্রথমে। কমনওয়েলথের মতো এবারও বাজিমাত করে দিতে পারেন তিনি। হিজাব পরে বার্মিংহামের রিং মাতানোর এবার পালা প্যারিসে।
কিন্তু রিংয়ে নামার আগে ফ্রান্সের হিজাবনীতি নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন রাহিমি। তিনি হিজাবের মাধ্যমে তার ধর্মের প্রতি বিশ্বাস দেখাতে পারবেন কিন্তু ফ্রান্সের অ্যাথলেটদের এই সুযোগ না দেওয়াটা দুঃখজনক। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘ফ্রান্সের এই নিয়ম এবং পুরো পরিস্থিতিÑ এটি দুঃখজনক। আমি এখানে (অলিম্পিকে) এসে গর্বিত। আমার মন খারাপ কারণ আমি এখানে হিজাব পরতে পারছি কিন্তু ফ্রান্সের বাকি অ্যাথলেট ও মানুষ তা পারছে না।’
নারীদের হিজাব পরার অনুমতি দিয়ে ফ্রান্স তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে বলে আশাবাদী অস্ট্রেলিয়ান বক্সার টিনা রাহিমি জানান, ‘আমার এখনো ফরাসি অ্যাথলেটদের জন্য খারাপ লাগছে এবং আমি আশা করছি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে ওদের (ফরাসি নারী) জন্য এবং ওরা অংশগ্রহণ করতে পারবে। সব নারীর তার মন মতো পোশাক পরার স্বাধীনতা রয়েছে।’
আগামী ৩০ জুলাই থেকে অলিম্পিকের বক্সিংয়ে ফিদারওয়েট ক্যাটাগরির খেলা শুরু হবে। রাউন্ড অব ১৬-তে সরাসরি খেলবেন অস্ট্রেলিয়ার এই ইরানিয়ান বংশোদ্ভূত এই বক্সার। তার প্রথম খেলা ২ আগস্ট রাতে, প্রতিপক্ষ হয়নি এখনো চূড়ান্ত।
