মিডিয়া মোড়ল রুপার্ট মারডক নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের স্বার্থে বঞ্চিত করছেন নিজের তিন সন্তানকে। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
মিডিয়া মোড়ল রুপার্ট মারডকের বয়স ৯৩ হয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবে তার বিশাল সাম্রাজ্যের ভার তুলে দিতে হবে উত্তরাধিকারীদের হাতে। তবে গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সেখানে ‘পলিটিকস’ করছেন মারডক। তার দৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে এক ছেলেই আস্থাভাজন। সে জন্য নিজের সব মিডিয়ার দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে দিতে চান। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মারডক ঘোষণা দিয়ে সব মিডিয়ার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। আর সে সাম্রাজ্যের ভার তুলে দেন ছেলে লাচলানের হাতে। মারডক তার ঘোষণা অনুযায়ী ফক্স ও নিউজ কর্প-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে এখন ইমেরিটাস চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, তাদের হাতে আসা আদালতের নথি অনুসারে, রুপার্ট মারডক তার মিডিয়া সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিন সন্তানের সঙ্গে একটি আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছেন। তিনি চান তার সব মিডিয়া রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হোক। লাচলানকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস অটুট রাখতে চান। তবে প্রথমে মারডক মারা গেলে তার ট্রাস্ট চার সন্তান নিয়ন্ত্রণ করবেন বলে নির্ধারিত হয়। কিন্তু পরে তিনি আদালতে আবেদন করেন, শুধু লাচলান রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থি ভাইবোনদের হস্তক্ষেপ ছাড়া কোম্পানি পরিচালনার ক্ষমতা পাবেন। এর মাধ্যমে মারডক তার রক্ষণশীল সম্পাদকীয় নীতি টিকিয়ে রাখতে চান। লাচলানের তিন ভাইবোন জেমস, এলিজাবেথ এবং প্রুডেন্স অবশ্য মারডককে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখতে একত্র হন। আর লাচলান মারডকেরই পক্ষে।
মারডকের মোট সন্তানের সংখ্যা ছয়। যাদের মধ্যে ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় চারজনের ভোটাধিকার রয়েছে।
ছয় সন্তান
মারডকের দ্বিতীয় স্ত্রী আনা মারডকের সন্তান জেমস, এলিজাবেথ এবং লাচলান। তার সঙ্গে বিচ্ছেদের সময় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে ট্রাস্ট গঠিত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে ওয়েন্ডি ডেংকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে জন্ম নেয় দুই সন্তান। আর প্রথম স্ত্রীর একমাত্র সন্তান প্রুডেন্স। মূলত দ্বিতীয় স্ত্রীর তিন সন্তানের ভেতর জেমস এবং লাচলানের মধ্যে সমস্যা দেখা দেয়। আবার বাবার সম্পদ নিয়ে জেমস এবং এলিজাবেথও এক পর্যায়ে একে-অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ সুযোগে শেষ পর্যন্ত কোম্পানির দখল নেন লাচলান। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে তারা নিজেদের এমনকি বাবা মারডকের সঙ্গেও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। জেমস মাঝখানে লাচলানকে সাহায্য করলেও ২০১৯ সালে সেটি ছেড়ে দেন। এখন একটি বিনিয়োগ তহবিলের তত্ত্বাবধান করেন। তাদের বোন এলিজাবেথ একটি সফল সিনেমা স্টুডিও চালান। তিনি সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিজেকে পরিবারের ‘সুইজারল্যান্ড’ বা শান্তির জায়গা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছেন। প্রুডেন্স মারডকের প্রথম স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন। তিনি সবার বড় সন্তান। পারিবারিক ব্যবসায় সবচেয়ে কম জড়িত এবং নিজেকে নিয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। এখন মারডক জীবনের শেষ সীমায় এসে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা ফক্স নিউজ, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সংবাদপত্র ও টেলিভিশন আউটলেটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিস্তৃত লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর এর মূলে রয়েছে রাজনীতি এবং ক্ষমতা। প্রথমে যে দলিল মারডক তৈরি করেছিলেন, সেটি ছিল ২৫ বছর আগে। যার ভিত্তিতে তার ট্রাস্টে চার সন্তানেরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের পর তার পরিবারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তীব্রভাবে আলাদা হয়ে গেছে। ট্রাম্পের পক্ষে মারডক এবং লাচলান এক হয়ে যান। তারা তাদের পরিবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফক্স নিউজকে আরও ডানদিকে ঠেলে দেন। যা অপর তিন সন্তানের অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। মারডক ভেবেছিলেন, তার সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন দলিল পরিবারের শান্তি বজায় রাখবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উল্টোটা হবে। যার আভাস মারডক জীবদ্দশাতেই পেয়ে গেছেন।
সমস্যা ফক্স নিয়ে
আগের চুক্তি সংশোধন করে পিটিশন দাখিলের পর মারডক লন্ডনে এলিজাবেথ এবং প্রুডেন্সের সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেন তাদের সমর্থন পাওয়ার আশায়। তবে এ দুই সন্তান মারডককে হতাশ করেন। তারা নতুন প্রস্তাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এর কয়েকদিন পর মারডকের প্রতিনিধিরা তড়িঘড়ি করে পরিবর্তনগুলো আনার চেষ্টা করেন। যদিও আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা ব্যর্থ হন। গত মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় মারডকের পঞ্চম স্ত্রী হিসেবে এলেনা জুকোভাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেননি তিন সন্তান। তবে লাচলান সেখানে হাজির ছিলেন।
মারডকের আইনজীবীরা জানান যে, তিনি জেমস, এলিজাবেথ এবং প্রুডেন্সকে রক্ষার চেষ্টাই করছেন। কারণ তারা ফক্সের রাজনীতিকে মধ্যপন্থি ধারায় আনার চেষ্টা করবেন। অন্যদিকে তিনি এবং লাচলান চাচ্ছেন এ সংবাদমাধ্যমটি ডান ধারাতেই থাকুক। যদি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই এ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তখন ফক্সের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিবারের সদস্যদের লড়াইয়ের কারণে এর কার্যক্রম ব্যাহত হবে। মারডক এ নিয়ে উদ্বিগ্ন যে, তার সন্তানদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব সম্পাদকীয় নীতিকে অস্থির করে তুলবে। তার উদ্দেশ্য হলো, লাচলানের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা এবং তার হাতে কোম্পানির ওপর স্থায়ী ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া। তবে এলিজাবেথ, প্রুডেন্স এবং জেমস বলছেন, তাদের বাবা ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টায় আছেন।
মারডকের সাম্রাজ্য প্রধানত দুটি কোম্পানির মধ্যে বিভক্ত। একটি হলো ফক্স; যার মধ্যে রয়েছে ফক্স নিউজ এবং ফক্স ব্রডকাস্ট নেটওয়ার্ক। অন্যটি নিউজ কর্প, যার অধীনে অনেকগুলো প্রধান সংবাদমাধ্যম রয়েছে। মারডকের ছয় সন্তানেরই এসব সম্পদের সমান অংশে মালিকানা রয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন ক্লো এবং গ্রেস, যারা তার তৃতীয় স্ত্রী ওয়েন্ডি ডেংয়ের সন্তান। কিন্তু ওই দুজনের মতামত দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। ট্রাস্টের বোর্ডে মারডক এবং তার চার বড় সন্তানের মধ্যে ভোটাধিকার ভাগ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মারডকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি মারা যাওয়ার পর লাচলান, জেমস, এলিজাবেথ এবং প্রুডেন্স একটি করে ভোটাধিকার ভোগ করবেন। মারডক ২০০৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি যদি আগামীকাল একটি বাসের নিচে পড়ে মারা যাই, তাহলে তাদের চারজনকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কে নেতৃত্ব দেবে।
কারণটা রাজনৈতিক
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে লাচলানকে যেন চ্যালেঞ্জ করা না যায়, সে জন্য তিনি তার ভোটের ক্ষমতা বাড়াতে চান। তবে এ পরিবর্তন কোম্পানিতে কারও মালিকানা নষ্ট হবে না। মারডক দুজন নির্বাহীকে তার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে ট্রাস্টে যুক্ত করেছেন। একজন হলেন উইলিয়াম পি. বার। যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের অধীনে একজন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কাজ করেছিলেন। বুশ এবং ট্রাম্প আবার মারডকের সর্বশেষ বিয়েতেও অতিথি ছিলেন।
মূলত ২০১৯ সালে লাচলানকে ফক্স এবং নিউজ করপোরেশনের দায়িত্বে দেওয়ার পর জেমসও তার সঙ্গে ছিলেন। জেমস এবং লাচলান ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফক্স পরিচালনার ভার ভাগ করে নেন। যা ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ভেঙে যায়। ট্রাম্পকে নিয়ে ফক্সের একটি নেতিবাচক প্রতিবেদনের জেরে দুই ভাইয়ে বিভক্তি দেখা দেয়। যার জেরে জেমস ক্ষুব্ধ হন। ২০১৯ সালে লাচলান চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহীর পদে বসলে জেমস ২০২০ সালে নিউজ করপোরেশন বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেন।
জেমস এবং তার স্ত্রী ক্যাথরিন দীর্ঘদিনের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। ২০২০ সালের গোড়ার দিকে অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল ধ্বংসের পর তারা দ্য ডেইলি বিস্টের কাছে একটি বিবৃতিতে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ফক্স-এর আচরণ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাওয়ার মুখে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটলে দাঙ্গার ঘটনায়ও জেমস পরোক্ষভাবে ফক্স নিউজের সমালোচনা করেন।
জেমস লাচলানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করবেন কি না বা তার বোনদের সমর্থন পাবেন কি না তা সবসময়ই অস্পষ্ট ছিল। তবে মারডকের নতুন উদ্যোগ সেই অস্পষ্ট অবস্থা কাটাচ্ছে। এখন মনে করা হচ্ছে মারডকের বাকি তিন সন্তান লাচলানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। তারা কোনো ধরনের উগ্র ডানপন্থি অবস্থাকে প্রশ্রয় দিতে চান না। তাদের মত হলো, শুধু একটি পক্ষেই পারিবারিক নিউজ আউটলেট প্রচার হবে, সেটা তারা চান না। সেখানে বিভিন্ন মত ও পথের মিলন থাকবে। জেমস এবং মারডকের অন্য সন্তানরা এতটা উদার হলেও লাচলান ততটা নন। তিনি ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালে তার প্রশাসনের পক্ষেই ছিলেন। এমনকি সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ট্রাম্পের পক্ষে এমনভাবে কাজ করেছেন, যাতে ফক্সের ওপর আস্থা কমে যায় পাঠকদের। ফক্স নিউজ ট্রাম্পের মুখপাত্র হয়ে ওঠে অনেকটা। বিশ্বের পাঠক মহলের কাছে যে কারণে এর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। শুধু ট্রাম্প সমর্থকরা একে নিজেদের প্রচার মাধ্যমে হিসেবে ভাবতে শুরু করেন।
মারডকের অটল রাজনৈতিক বিশ্বাস তার পরিবারেও সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এ সংকট সহজে মিটবে না। যার পরিণতি কী হয়, বোঝা মুশকিল। হয়তো ফক্স ভাগ হয়ে যাবে। অথবা এর নীতি পরিবর্তিত হবে। ট্রাম্প আবার নির্বাচনে জিতে না এলে ফক্স তার নীতি থেকে সরে আসার কারণও খুঁজে পাবে। লাচলানের জন্য তখন অন্য ভাই-বোনদের সঙ্গে সমঝোতায় আসা সহজ হওয়ার কথা।
