কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব সম্পদ ধ্বংস হয়েছে সেগুলো আবার করা যাবে। তবে যত প্রাণহানি হয়েছে তার তুলনায় এসব ধ্বংস কিছুই না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের সামনে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এমন মন্তব্য করেন।
সোহেল তাজ বলেন, বিবেকের তাড়নায়, সাধারণ নাগরিক হিসেবে ডিবিতে এসেছি সমন্বয়কদের সঙ্গে দেখা করতে, দেশের ওপর সবার হক আছে। এজন্য এসেছি ছাত্র-ছাত্রীদের বুকে যেন আর একটাও গুলি না করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনুরোধ, প্রত্যেকটা প্রাণহানির বিচার করতে হবে। এর আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে থাকা কোটা আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ডিবি কার্যালয়ে যান সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই দেশ তোমাদের, আশা ছাড়া যাবে না। সব সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। ছয় সমন্বয়ককে ছাড়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল তাজ জানান, আমি বিষয়টি নিয়ে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে বলেছেন ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি পেলে ছাড়া হবে।
ডিবি হেফাজতে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে দেখতে গতকাল গিয়েছিলেন সোহেল তাজ। কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি তাকে। কখন এই সমন্বয়কদের ছাড়া হবে, সে বিষয়েও কোনো সদুত্তর পাননি তিনি।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সোহেল তাজ বলেন, ‘বিবেকের তাড়নায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়কদের খোঁজ নিতে এসেছি। ওই সমন্বয়কদের কেন এখানে আনা হয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না এবং কখন মুক্তি দেওয়া হবে এসব বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের কাছে জানতে চেয়েছেন। কিন্তু তার কোনো প্রশ্নেরই সন্তোষজনক জবাব পাননি।
নাহিদ ইসলামসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাত সমন্বয়ক বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে আছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে সেখানে চিকিৎসাধীন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ তিন সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে আসেন ডিবির কর্মকর্তারা। পরের দুই দিন আরও বাকি সমন্বয়কদের তুলে আনেন তাঁরা।
সোহেল তাজ বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দেশে অশান্তি বিরাজ করছে। এখানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। নিরীহ পাঁচ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৮-১০-১৫-১৬ বছরের ছাত্র, সাধারণ মানুষসহ অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এটা আমাদের সবাইকে আহত করেছে। আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এই বিবেকের কারণেই ব্যক্তিগতভাবে ডিবি অফিসে এসেছি।’
সমন্বয়কদের বিষয়ে প্রশ্ন রেখে সোহেল তাজ বলেন, একজন নাগরিক যদি অনুরোধ করে, তাহলে নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অনুরোধের বাইরে যদি নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়, তাহলে এটা কি নিরাপদ হেফাজত নাকি গ্রেপ্তার?
সোহেল তাজ বলেন, ‘এই ছাত্র আন্দোলন ঘিরে যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কিছুই নয়। ক্ষয়ক্ষতি কোনো বিষয় নয়। যে সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, সেগুলো তো জনগণের করের টাকায় করা হয়েছে। এগুলো জনগণের সম্পদ। এগুলো হয়তো ভবিষ্যতে আবার গড়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু একটি প্রাণ যেটা আমরা হারিয়েছি, একটি প্রাণও কি আমরা ফেরত পাব? এই প্রাণ কি ফিরে আসবে? আমাদের মনে রাখতে হবে, মুখ্য জিনিসটা কী? প্রাণের মূল্য কিন্তু কোটি কোটি টাকার চেয়ে অনেক বেশি।’
চলমান পরিস্থিতিতে সরকার কোনো ভুল পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল তাজ বলেন, ‘এখানে সমূহ সমাধান প্রয়োজন। সমাধানের প্রথম কাজ যেটা করতে হবে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্টভাবে স্বতন্ত্রভাবে তদন্ত করে বিচার করতে হবে। এগুলোর জন্য যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড করা যাবে না। এই সমাধান রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। সমাধান সবাইকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে।’
আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর কোনো বার্তা আছে কি না, এমন প্রশ্নে সোহেল তাজ বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন যেন বিনষ্ট না হয়। এই দেশ তোমাদের। এই দেশ তোমাদেরই গড়তে হবে। ডু নট লুজ হোপ (আশা ছেড়ো না)। সামনে ভালো দিন আসবে, আশা ছাড়া যাবে না। এই দেশ তোমাদের সম্পদ। তোমাদেরই গড়তে হবে।’
