বাংলাদেশে ফেসবুক ইউটিউব টিকটকের স্ববিরোধী আচরণ

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪, ০৭:০১ এএম

ফিলিস্তিনে নিরীহ মানুষের ওপর ইসরায়েলিদের বর্বর হামলা কিংবা মিয়ানমারে মুসলমানদের গণহত্যার বিভিন্ন ভিডিও, ছবি ও লেখা প্রকাশ পেলে স্পর্শকাতরতার কথা বলে খুব দ্রুত সেগুলো সরিয়ে নেয় ফেসবুক ও টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর কিংবা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও সেসব কনটেন্ট খুব কমই সরানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুস্ট করে সেসব কনটেন্ট বেশি মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে নানা ধরনের কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ জানিয়েও কাক্সিক্ষত সাড়া মেলেনি। ওই ভিডিও বা কনটেন্টে মানুষের আগ্রহ বেশি দেখে সেগুলো সাধারণত সরানো হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়ে বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসে ব্যাখ্যা দিতে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে তারা ঢাকায় আসবে কি না, সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সর্বশেষ স্বচ্ছতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯১টি অনুরোধের মাধ্যমে ২ হাজার ৯৪৩টি কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ করে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু প্রায় ৭৬ শতাংশ কনটেন্ট সরায়নি গুগল। এর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে গুগল কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ১৮ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট তথ্য ছিল না। প্রায় ১১ শতাংশের ক্ষেত্রে আগেই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৮ শতাংশের ক্ষেত্রে নীতি অনুযায়ী সরানো হয়। অবশ্য গুগলের দাবি, বাংলাদেশ সরকার যেসব কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ করেছিল, তার মধ্যে ৫২ শতাংশ অনুরোধ সরকারের সমালোচনাসংক্রান্ত।

২০২২ সালে গুগল প্লে স্টোর থেকে আটটি অ্যাপ এবং একটি লিংক সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিল বিটিআরসি, যেগুলো জুয়া ও বাজির প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছিল। গুগল তাদের প্লে স্টোরের নীতি লঙ্ঘন করায় অ্যাপগুলো সরিয়ে নেয়। তবে বিটিআরসি একটি ভিডিও চিত্রের লিংক সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলেও তা সরায়নি গুগল। এর কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছিল, ওই ভিডিওচিত্রে দুজন ভুক্তভোগীর নির্যাতনের বিবরণ রয়েছে, যেটি নিয়ে জনসাধারণের আগ্রহ ব্যাপক। এ ছাড়া এই ভিডিও সরানোর জন্য আদালতের বৈধ কোনো আদেশ ছিল না। তাই তারা সরিয়ে নেয়নি।

গুগলের স্বচ্ছতা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বিভিন্ন দেশের ভিডিও সরানোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। কনটেন্ট সরিয়ে নিতে ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে গুগলের কাছে বাংলাদেশ সরকার যত অনুরোধ করেছে, তাতে অর্ধেকের কম ক্ষেত্রে (৪২ দশমিক ৮ শতাংশ) সাড়া পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটক বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে সাড়া দিয়েছে।

ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার স্বচ্ছতা প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৯৮৮টি অনুরোধ করে। এর বিপরীতে ৬৭ দশমিক ২১ শতাংশ তথ্য সরবরাহ করেছে তারা। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার মেটার কাছে ৮৩৬টি অনুরোধ করেছিল। ওই সময়কালে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ তথ্য সরবরাহ করেছিল মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ফেসবুকের কাছে ১ হাজার ১৭১টি অ্যাকাউন্ট বা ব্যবহারকারীর তথ্য চেয়েছিল সরকার। ওই সময়ে ব্যবহারকারীদের তথ্যের জন্য ৬৫৯টি অনুরোধ পাঠানোর জবাবে ৬৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ অ্যাকাউন্টের তথ্য সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ২০২১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ৫২৫টি অনুরোধ পাঠিয়েছিল। যার মধ্যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ৬৬ দশমিক ৮৬ শতাংশের জবাব দিয়েছিল।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে টিকটক থেকে ১ হাজার ৯২৩টি ভিডিও ও ৮০টি অ্যাকাউন্ট ডিলিট বা মুছে ফেলার জন্য ৮৬টি অনুরোধ করে। এসব অনুরোধের বিপরীতে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ৬৫৯টি ভিডিও ও ৬টি অ্যাকাউন্ট মুছে দেয় টিকটক। এর আগে টিকটক থেকে ১৬টি অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার জন্য সরকার ৫টি অনুরোধ পাঠিয়েছিল, যার মধ্যে ৬টি অ্যাকাউন্ট মোছা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির নির্দেশিকা লঙ্ঘনের কারণে।

ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, “ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক তাদের নিজেদের গাইডলাইন (নীতিমালা) নিজেরাই মানে না। একেক দেশে একেক রকম আচরণ করে। বাংলাদেশে সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য যেসব ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপ থেকে ফেসবুক সেগুলো বন্ধ করছে না। তারা বাংলাদেশের আইনকে কোনোভাবে মানছে না, আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা কোনো কিছুকেই তারা সম্মান দেখাচ্ছে না। তাদের চিঠি দিয়ে ডাকা হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না দিলে প্রয়োজনে তাদের ওপর ‘রেসট্রিকশন (বিধিনিষেধ)’ আরোপ করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটককে গত শনিবার চিঠি দেওয়া হয়েছে বিটিআরসি থেকে। চিঠিতে গত এক মাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সহিংসতা ও গুজব ছড়িয়ে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো (কনটেন্ট) সরাতে অনুরোধ করা হয়েছে। যতটুকু সরানো হয়েছে, তা নগণ্য ও অগ্রহণযোগ্য। আইন মেনে তারা বাংলাদেশে সাইবারজগৎ ব্যবহার করতে চায় কি না, সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে ফেসবুক কথা শুনলেও এখন না শুনলে তারা নিজেরাই নিজেদের আইন লঙ্ঘন করছে। ফেসবুক এখন গুজবের কারখানায় পরিণত হয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে তাদের ফ্যাক্ট চেকার রয়েছে। কিন্তু তারা সেটি করছে না।’

তিনি আরও বলেন, “এর আগে আমি দায়িত্বে থাকাকালে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছিলাম। সেখানে বলা হয়েছিল ফেসবুক বাংলাদেশে ব্যবসা করে যে অর্থ আয় করছে, সেটি তাদের দেশে নিতে বিটিআরসির ‘ক্লিয়ারেন্স’ নেওয়ার পরই যেন ওই অর্থ ছাড় করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি এখনো কার্যকর করেনি। এখন তাদের ডাকা হয়েছে। তারা এসে নানা অজুহাত দেখাবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কঠোর হয় এবং বিটিআরসি থেকে ক্লিয়ারেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করে তাহলে কিন্তু ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরকারের কথা শুনতে বাধ্য থাকবে।”

চাকরিবিষয়ক ওয়েবসাইট বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ফাহিম মাশরুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সারা বিশ্বে একই ধরনের গাইডলাইন। এসব মাধ্যম ব্যবহার করে যেমন ভুল তথ্য ছড়ানো হয়, সেই সঙ্গে ইতিবাচক বিষয়গুলোও প্রচার করা হয়। তবে দেশে যে পদ্ধতিতে ফেসবুক বন্ধ করা হয়েছে, তা কাম্য নয়। ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধ থাকলেও ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ভিপিএন ব্যবহার করছে।

তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ করে কোনো সমাধান হবে না। সরকার তথ্য অবাধ করলে গুজব ছড়ানোর সুযোগ কম থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট বন্ধের সময়ে গুজব আরও বেশি ছড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের অবাধ প্রবাহ থাকলে মানুষের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ বেশি থাকে।’

ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজস্ব কোনো অফিস নেই। আবার তাদের ব্যবসাও সেই তুলনায় কম। কিন্তু ভারতে ফেসবুকের অফিস রয়েছে। ফলে সে দেশের সরকার কিছু বললে সেটা গুরুত্ব বেশি দেয়। এসব কারণে বাংলাদেশ সরকারের কথা শুনতে তাদের আগ্রহ কম দেখা যায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত