চলমান পরিস্থিতিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ চারটি খাত বিদ্যুৎ-জ্বালানি, টেলিকম, ব্যাংকিং ও তৈরি পোশাক খাতে সাইবার হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, এসব খাতের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারি-বেসরকারিসহ ব্যক্তিপর্যায়েও সাইবার হামলা হতে পারে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মদদে দেশে সাইবার হামলার অপচেষ্টা চলছে। ব্যক্তিপর্যায়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে রাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আয়োজিত এক জরুরি সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে ৩৫টি কেপিআইয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে মিথ্যা গুজব ও অপপ্রচার বন্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলে শুধু টিকটক জবাব দিয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউব এখনো কোনো সাড়া দেয়নি। আগামীকাল তাদের ঢাকায় এসে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত ১০ দিনে সরকারের ৮টি ওয়েবসাইটে ৫০ হাজারের বেশি সাইবার হামলা হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। তবে কোনো তথ্য বেহাত হয়নি। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ নাগরিকদের নিয়ে সাইবার নিরাপত্তা ফোরাম গঠন করা হবে। যাদের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে ভালো জ্ঞান আছে, এমন নাগরিকদের দেশে সাইবার নিরাপত্তায় এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে হামলা হয়নি। এমনকি কোনো ওয়েবসাইট থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্যও নিতে পারেনি সাইবার হামলাকারীরা।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট করার পরামর্শ দিয়ে পলক বলেন, ‘ভিপিএন ব্যবহার সাইবার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার না করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কিছু সিকিউরিটি প্রটোকল মেনে চলা দরকার। একই সঙ্গে এ মুহূর্তে দেশের সাইবার নিরাপত্তা সমুন্নত রাখার জন্য সবার কাছে সহযোগিতা চাই। কোনো প্রতিষ্ঠান সাইবার হামলার শিকার হলে তা আইসিটি বিভাগকে জানাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সাইবার ঝুঁকিতে থাকা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না। তারা পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও সম্পন্ন করতে পারেনি।’
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে কেউই শতভাগ সাইবার ঝুঁকিমুক্ত নয় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরাও অনেকবার সাইবার হামলার শিকার হয়েছি। তাই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সবাইকে বলব, নির্দেশনাগুলো মেনে চলতে এবং অস্বীকৃত ও লাইসেন্সবিহীন অ্যাপ বা পোর্টাল ব্যবহার না করতে।’
সাইবার হামলা থেকে বাঁচতে এবং সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাইবার হামলা মোকাবিলার জন্য আমরা তিন ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছি। এগুলো হলো প্রিভেনটিভ মেজার, ইনসিডেন্ট রেসপন্স ও পোস্ট ইনসিডেন্ট রেসপন্স। পাশাপাশি সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারি। যেমন আক্রান্ত হলে ওয়েবসাইটটা অফলাইনে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত পাসওয়ার্ড আপডেট করা, যেকোনো পোর্টালে লগইনের ক্ষেত্রে মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করা, সিকিউরিটি অডিট করা।’
সরকারের চিঠির জবাব দেয়নি ফেসবুক : মিথ্যা গুজব ও অপপ্রচার বন্ধে ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গত শনিবার চিঠি দিয়েছিল বিটিআরসি। সরকারের দেওয়া চিঠির ব্যাপারে টিকটক জবাব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফেসবুক এখনো জবাব দেয়নি। তাদের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময় আছে। জবাব পাওয়া সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
সরকার ইন্টারনেট সেবাকে রেস্ট্রিকটেড করে রাখেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ফ্রিল্যান্সারদের ক্যাশ ইনসেন্টিভ দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হবে।
সভায় টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ড. মো. মুশফিকুর রহমান, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক রণজিৎ কুমার, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি ইমদাদুল হক, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিভিল এভিয়েশন, পুলিশ, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
