কখনো ভাবিনি এত তাজা প্রাণ ঝরে পড়বে : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৪, ০২:৩৩ এএম

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছি। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংস্থা আছে, বিশেষ করে তাদের কাছেও আমরা সহযোগিতা চাই। যেন এ ঘটনার যথাযথ সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং এর জন্য দায়ীদের সাজার ব্যবস্থা করা যায়।’

গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৪’ উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আমরা জুডিশিয়াল কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কারও দাবির অপেক্ষায় আমি থাকিনি।’

কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘যেসব স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে, সেগুলো নতুন করে নির্মাণ করা যাবে। কিন্তু যেসব প্রাণ চলে গেছে তা আমরা আর কখনো ফিরে পাব না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনকারীদের প্রতিটি দাবি তিনি পূরণ করেছেন। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। তাই আন্দোলন করার কোনো কারণই ছিল না।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘এরপরও এ ধরনের ঘটনা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঘটানো হলো। তারপর আন্দোলনের নামে অনেকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো। আমি কখনো ভাবিনি যে এই সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং এত তাজা প্রাণ ঝরে পড়বে।’

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিজের কোনো ঘাটতি ছিল না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, এখানে আমার কোনো ঘাটতি ছিল না। আর তাদের দাবি মানব কি, যেটা আমি করে দিয়েছি সেটাই তো, এটা তো আমারই করা, ইস্যুটা তো আমারই। আপিল করা হয়েছে অ্যাপিলেট ডিভিশনে। তারপরও এই যে একটা ঘটনা ঘটিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে দেশকে পেছনে টেনে নেওয়ার এই চক্রান্তে যারা জড়িত, সেটা আপনাদের খুঁজে বের করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘জানি না, অপরাধটা কী ছিল আমার? যে ইস্যুটা নেই, সেটা নিয়ে আন্দোলনের নামে এই ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করে দেশের অর্জনকে নষ্ট করা, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করাতে কে কী অর্জন করল, সেটাই আমার প্রশ্ন?’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমার কাছে ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, আমি তো আরাম-আয়েশ করার জন্য ক্ষমতায় আসিনি। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি দেশকে একটু উন্নত করতে। যেটা সফলভাবে করতেও পেরেছি। আজ বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল।’ সেই মর্যাদাকে কেন নষ্ট করা হলো সে প্রশ্ন উত্থাপন করে এর বিচারের ভার দেশবাসীর কাছে দেন তিনি।

মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেশের মৎস্য খাতে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাদের ছয়টি স্বর্ণপদক, আটটি রৌপ্যপদক ও আটটি ব্রোঞ্জপদক এবং সার্টিফিকেট দেন। পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৫ জন খামার মালিক, দুজন মৎস্য কর্মকর্তা, একজন প্রকল্প পরিচালক, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন অ্যাসোসিয়েশন লিডার, একটি প্রকল্প ও একটি কমিটি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জেলেদের স্মার্ট কার্ড দিতে সরকারি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দুজন জেলেকে স্মার্ট পরিচয়পত্র দেন। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রহমান দেশের মৎস্য খাতে অসামান্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিশেষ স্মারক তুলে দেন।

শ্রীলঙ্কার মতো সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা ছিল, প্রণয় ভার্মাকে প্রধানমন্ত্রী : গতকাল বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নৈরাজ্যবাদীরা দেশে শ্রীলঙ্কা টাইপের তাণ্ডব সৃষ্টির চেষ্টা এবং তারা সরকার পতনের পরিকল্পনা করেছিল। ভারতীয় হাইকমিশনার গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক আন্দোলন মোটেও স্বাভাবিক আন্দোলন নয়। একপর্যায়ে এটি প্রায় সন্ত্রাসী হামলায় পরিণত হয়।

এ সময় ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতায় জীবন ও সম্পদহানির ঘটনায় শোক জানান। ধারাবাহিকভাবে পরিস্থিতির স্বাভাবিক হওয়া ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাকে স্বাগত জানান তিনি।

প্রণয় ভার্মা বলেন, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত সব সময় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের ভিশন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে সমর্থন করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর প্রসঙ্গে প্রণয় ভার্মা বলেন, তার সাম্প্রতিক সফল অর্থবহ ফলাফল অর্জন করেছে, যা অতীতের অর্জনকে সুসংহত করেছে এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার একটা ব্লু-প্রিন্ট সৃষ্টি করেছে।

হাইকমিশনার আরও বলেন, দুই দেশের যে জাতীয় ডেভেলপমেন্ট ভিশন, বাংলাদেশের ২০৪১ এবং ভারতের ২০৪৭ ভিশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতার একটা নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। ডিজিটাল ও গ্রিন অংশীদারত্ব, স্যাটেলাইটের যৌথ উন্নয়ন, ব্লু-ইকোনমি, ওশানোগ্রাফি, ফিনটেকসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা হবে।

আঞ্চলিক কানেকটিভি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চার দেশের (বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, নেপাল ও ভুটান) মধ্যে কানেকটিভিটি জোরালো করার জন্য আমার সব দরজা খোলা।’

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন এবং মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

আহতদের দেখতে কুর্মিটোলা হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশব্যাপী সাম্প্রতিক সহিংসতায় আহতদের দেখতে গতকাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। গতকাল বিকেল ৫টার পর তিনি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনে আহত সেখানে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের অবস্থার খোঁজখবর নেন।

তিনি আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। আঘাতের তীব্রতা দেখে ও হামলার নৃশংসতার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী মহাখালীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজিজেস অব দ্য চেস্ট অ্যান্ড হসপিটালে আহতদের দেখতে যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত