চট্টগ্রামে হামলার বর্ণনা আহতদের মুখে

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৪২ এএম

‘আমরা ছিলাম ছয়তলার ছাদে। ওরা গেট ভেঙে ছাদে ঢুকে লোহার পাইপ ও হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। দেশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। অনেকে মার সহ্য করতে না পেরে, প্রাণে বাঁচতে, পিছিয়ে গিয়ে ছাদের রেলিং ধরে ঝুলতে থাকে। ওরা হাতুড়ি রড দিয়ে হাত থেঁতলে দেয়। তখন আমাদের ছেলেরা ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায়। পাশের বিল্ডিং ছিল আটতলা। ওরা সেই ছাদ থেকেও আমাদের ওপর বড় বড় পাথর ছুড়তে থাকে।’

কোটা আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলা ছাত্রলীগ নেতা ইকবাল হোসেন এভাবেই সেদিনের নৃশংসতার বর্ণনা দেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিন ব্লকের ৬০৭ (বি) নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন ইকবাল হোসেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রামের মুরাদপুরের বেলাল মসজিদের গলির সেই ছয়তলা ভবনের ছাদে তাদের ওপর আন্দোলনকারীরা হামলা চালায় বলে ইকবাল দাবি করেন। গত বৃহস্পতিবার ইকবাল এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমিও রেলিং ধরে ছিলাম। তখন ওরা হাতে আঘাত করতে করতে আঙুলগুলো থেঁতলে দেয়। একসময় ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাই। নিচে পড়ার পরও আমার জ্ঞান ছিল। কিন্তু উঠতে পারছিলাম না, সব দেখতে পাচ্ছিলাম। এ সময় পাশের ছাদের ওপর থেকে আমাকে পাথর মারা হচ্ছিল। পাথরে মুখ থেঁতলে যায়। একজন প্লাস্টিকের নীল রঙের পাইপ দিয়ে আমাকে পেটায়। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’

শুধু ইকবালই নন, সেদিন চট্টগ্রামের সেই ভবনের ছাদে এভাবেই পেটানো হয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কমপক্ষে ৪০ নেতাকর্মীকে। পেটানোর পর সেই ছয়তলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে কমপক্ষে ১২ জনকে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে সরকার-সমর্থিত সংগঠনের ১২ নেতাকর্মী ভর্তি হয়েছিলেন বিএসএমএমইউতে। তাদের মধ্যে একজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন বাকি ১১ জনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিদের কেউ চিরতরে পঙ্গু, কারও মস্তিষ্ক বিকৃতি, কারও শরীরের একপাশ বিকলাঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন ও স্পিকার এসেছিলেন আহতদের খোঁজখবর নিতে।

বর্তমানে কেবিন ব্লকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন চট্টগ্রাম মহসিন কলেজের ছাত্রলীগকর্মী মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ নেতা মুহাম্মদ সোহেল, চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ইকবাল হোসেন, টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি মানিক শীল, কুমিল্লা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মোশারফ হোসেন মজুমদার মুন, আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এইচ এম মিজানুর রহমান জনি, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মাদ মাকসুদুর রহমান, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল কুদ্দুস, ঢাকা মহানগর হাজারীবাগ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাহফিন তুষার ও ঢাকার রামপুরা থানার এসআই মো. কামরুল হক জিহান।

এ ব্যাপারে বিএসএমএমইউর সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আহতদের মধ্যে তিনজন এখনো শঙ্কামুক্ত নন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ছাদ থেকে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে সোহেল নামের যে ছেলেকে তার অবস্থা খুব গুরুতর। জ্ঞান ফিরলেও তার হাত-পা অচল। একই ঘটনায় আহত জালালের জ্ঞান ফিরলেও তার চার হাত-পা ভাঙা। মাকসুদুল নামের একজনের অবস্থাও খুব খারাপ। মাথায় আঘাত পেয়েছে। এই তিনজন এখনো শঙ্কামুক্ত নন।

এই চিকিৎসক বলেন, কিছু রোগীকে অনেক দিন থাকতে হবে হাসপাতালে। সোহেলের মাথার হাড় খুলে রাখা হয়েছে। সেটা লাগাতে হবে। দুই-তিন মাস লাগবে। জালালকেও অনেক দিন থাকতে হবে। এর মধ্যে সোহেল বেঁচে থাকলেও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া নিয়ে শঙ্কা আছে।

চট্টগ্রামের আহতদের নিয়ে বিএসএমএমইউতে এসেছেন চট্টগ্রাম মহানগর কোতোয়ালি থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক অশিক পাল জিতু। গত বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে কথা হয় কেবিন ব্লকে। তিনি এসেছেন চট্টগ্রাম মহসীন কলেজ ছাত্রলীগকর্মী জালাল উদ্দিনের সঙ্গে। জিতু দেশ রূপান্তরকে বলেন, জালালের অস্ত্রোপচার হয়েছে ৩০ জুলাই। এখন আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে আছে। দুই পা ও এক হাত ভাঙা। ছাদ থেকে যখন মেরে ফেলে দেয়, তখন হাতের রগ কেটে দিয়েছিল। নিচে পড়ার পর আবার আরেক দলের একজন এসে চোখ উপড়ে নেওয়ার জন্য একটা পাইপ দিয়ে বারবার চোখে আঘাত করে।

চিকিৎসাধীন ইকবাল হোসেন দাবি করেন, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এলজিইডি শিক্ষা ভবন, মুরাদপুর কর্ণফুলী গ্যাস ভবন হামলা চালানোর পরিকল্পনার তথ্য তারা জানতে পারেন। তখন তারা সমাবেশ থেকে মিছিলসহ মুরাদপুরে যান। ওদের ধাওয়া দিয়ে বহদ্দার হাট পর্যন্ত নিয়ে যান। সেখান থেকে তারা আবার মুরাদপুরে অবস্থান নিতে যাওয়ার সময় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বহদ্দার হাট, পাঁচলাইশ, বিবিরহাট, দুই নম্বর রেলগেট সব দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।

তিনি বলেন, তারা ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল বেলাল মসজিদ গলিতে ঢুকে সেখানকার একটি আবাসিক ভবনের নিচে আশ্রয় নেন। ঘন্টাখানেক নিরাপদে ছিলেন। এরপর হামলাকারীরা কলাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকে। তখন ছাদে চলে যান। ওরা ছাদের টিনের গেট ভেঙে ছাদে চলে আসে ও হামলা করে।

টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি মানিক শীল। ১৮ জুলাই আন্দোলনকারীদের হামলার শিকার হন বলে দাবি করেন।

মানিক শীল বলেন, সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য ছোট মনিরের বাসায় যান। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়। আলোচনা শেষে বেরিয়ে শোনেন পুরনো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় খুব গন্ডগোল হচ্ছে। একটু এগোনোর পর দেখেন আন্দোলনকারীরা ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা নিয়ে এগিয়ে আসছে। কিছু সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। একপর্যায়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। কিন্তু তাকে একা পেয়ে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। পড়ে যাওয়ার পর সারা শরীরে আঘাত করে। হামলাকারীরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়।

তিনি বলেন, সেদিন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসার পথেও বাধা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। অ্যাম্বুলেন্স আটকে দিয়েছে। সেই পরিস্থিতির বর্ণনা করে মানিক শীল বলেন, চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে যেতে পারিনি। সেখানকার বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়েছে। সেখানে মাথায় সেলাই দেওয়ার সময় চিকিৎসকরা দেখেন মাথার এক অংশ দেবে গেছে। সেখানকার চিকিৎসকরা ঢাকায় আসার পরামর্শ দেন। কিন্তু পুরান বাসস্ট্যান্ড হয়ে ঢাকা মহাসড়কে ওঠার অবস্থা ছিল না। দেলদুয়ার দিয়ে পাটুরিয়ার দিকে এসে ঢাকার দিকে রওনা দিলে চন্দ্রায় কয়েকবার গাড়ি থামায় আন্দোলনকারীরা। কোনোমতে সাভার পৌঁছালেও আর সামনে এগোতে পারেননি।

মানিক শীল বলেন, সাভারে এনাম মেডিকেলে ভর্তি হই। সেখানে তিন দিন চিকিৎসা নিয়েছেন। পরে উন্নত চিকিৎসা নিতে ২২ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন।

ঢাকায় ধানমন্ডিতে একা পেয়ে কুপিয়েছে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এইচ এম মিজানুর রহমানকে। লালমাটিয়ার বাসিন্দা এই নেতা বর্তমানে অস্ত্রোপচার শেষে পর্যবেক্ষণে আইসিইউতে আছেন। তার স্ত্রী সেতু শাহিনা ইসলাম দিতি দাবি করেন, ১৯ জুলাই শুক্রবার ধানম-ির তিন নম্বর আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে ছিলেন মিজানুর রহমান জিতু। সন্ধ্যার আগে সিনিয়র নেতারা ১৪ দলের বৈঠকে গণভবনে চলে যান। রাত ১০টার দিকে খবর পান স্টার কাবাবের গলির দিকে আন্দোলনকারীরা টায়ার জ¦ালিয়েছে। পার্টি অফিস থেকে বের হয়ে সবাই সড়কে চলে আসে। দুপক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়। একসময় আন্দোলনকারীরা চলে যায়। জনিরা তখন সব গলিতে গলিতে ঢুকে দেখতে থাকে আন্দোলনকারীরা আর কেউ আছে কি না। এমন সময় জনি এক গলিতে একা পড়ে যায়। সেখানে ওকে ধরে মাথায় চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। বেধড়ক মারধর করে। জনির হাতও ভেঙে গেছে। ওখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন। পরিচিত একজন দেখে তাকে জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নিয়ে যান। ওখানে চিকিৎসা না পাওয়ায় সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আনা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত