চলমান কারফিউ, চোরাগোপ্তা হামলার শঙ্কা ও অনিরাপদ পরিবেশের কারণে সন্ধ্যার পরই রাজধানীর সড়ক থেকে উঠে যাচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক সদস্যরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভয়ানক সহিংসতার সময় পুলিশ ও পুলিশের স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনার পরে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদস্যদের। এ কারণে নিজেদের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে মাঠপর্যায়ে নানা কৌশলে কাজ করছেন তারা।
এর ধারাবাহিকতায় ট্রাফিক বক্সে অবস্থান এড়িয়ে চলাসহ অন্ধকারে সড়কে না থাকা ও দায়িত্বপালন শেষে সাদাপোশাকে বাড়ি ফিরছে পুলিশ। পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবার আর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে। এতে ট্রাফিকশূন্য সড়কের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় বাড়ছে যানজট, ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ পথচারীরা।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারফিউ যখন বলবত হয়, তখন গাড়ির চাপটা কমে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ মানুষের যাতায়াতটা কম থাকে। এ জন্য রাতে গাড়ি চলাচল এবং নিরাপত্তাসহ সার্বিকভাবে এসব করা হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাফিক বক্সে থাকাটা সব সময় নিরাপদ নয়। বক্সের বাইরে থাকা বেশি নিরাপদ। এ ব্যাপারে সবাইকে (ট্রাফিক) সচেতন করা হয়েছে। সবাই জানছে বক্সে কারা আছে, কয়জন আছে। বক্সের বাইরে থাকাটাই এ মুহূর্তে বেশি নিরাপদ। নিজের সেফটি, সিকিউরিটি নিজেই দিতে পারে।
তিন দিন সন্ধ্যার পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের কেন্দ্রগুলো ঘুরে ট্রাফিক পুলিশ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দেশ রূপান্তর। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টা, রাজধানীর মোহাম্মদপুর চৌরাস্তা। চারদিক থেকে আসা বাস, ট্রাক, রিকশা আর বাইকসহ নানা যানবাহনে বিশাল জট লেগে যায়। কে কোন দিক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে, সেটার কোনো হিসাব নেই। চার রাস্তার সংযোগস্থলে এই হ-য-ব-র-ল অবস্থার প্রভাব পড়ে অন্যান্য সড়কে। যানজটের সৃষ্টি হয় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের মূল দরজা, বসিলা ব্রিজ ও গাবতলী বেড়িবাঁধ পর্যন্ত। ফলে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টার বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় এ এলাকায় দেখা যায় তীব্র যানজট। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সন্ধ্যা নামলেই এমন অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলো দিয়ে চলাচলকারী নগরবাসীদের।
এই সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম। এত রাতেও তীব্র যানজট দেখে ভাড়ায় নেওয়া রিকশা থেকে নেমে হাঁটা ধরলেন বসিলা ব্রিজের দিকে। এ সময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয় কত দিন থেকে এমন অবস্থা? তিনি বলেন, কারফিউর আগে রাত ১০টার পরে এমন অবস্থা হতো এই সড়কে। এখন সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়। কারণ মাগরিবের আজানের পরই সব ট্রাফিক পুলিশ সদস্য চলে যান। একজনও থাকেন না। ট্রাফিক থাকলেই এই চার রাস্তার মাথা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এখন তো কোনোভাবেই কিছু করা যাবে না।
এই পথচারীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেল একটু সামনে এগোতেই। সড়কে কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই। বাধ্য হয়ে পথচারীরাই সড়ক ফাঁকা করতে নেমে এসেছেন। চার রাস্তার কেন্দ্রে ভাঙাচোরা ট্রাফিক পুলিশ বক্সটি ফাঁকা পড়ে আছে। এই ট্রাফিক পুলিশ বক্সে দুর্বৃত্তরা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়। শুধু এই ট্রাফিক পুলিশ বক্সই নয়। কাছাকাছি মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, আসাদ গেট, ধানমন্ডি ২৭, সায়েন্সল্যাব মোড়, কাঁটাবন, শাহবাগ এলাকার চিত্রও ছিল একই রকম।
ডিএমপি থেকে জানানো হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নামে ৬৯টি পুলিশ বক্স ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, দুটি উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কার্যালয়, চারটি সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কার্যালয়, দুটি পুলিশ ফাঁড়ি ও তিনটি থানায় তাণ্ডব চালায় দুর্বৃত্তরা। পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়েছে। এতে ৬১ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
গত শুক্রবার রাত ১০টা রাজধানীর মৎস্য ভবন এলাকা। অন্যান্য সময় গভীর রাত পর্যন্ত এই মোড়ে যানজট থাকে। গাড়ির চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খেতে হয় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের। তবে সেদিন এই মোড়ে কোনো ট্রাফিক পুলিশ ছিল না। যদিও হাতে গোনা দু-একটি যাত্রীবাহী বাস, রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছাড়া তেমন কিছুই চলাচল করছিল না। একই চিত্র মগবাজার মোড়ে। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় রাজধানীর কাকরাইল, মালিবাগ মোড় ঘুরেও ট্রাফিক পুলিশ দেখা যায়নি। মালিবাগ রেলগেটে কিছু যানবাহনের হালকা জট দেখা গেছে। সেটি সামলাচ্ছিলেন টহল পুলিশের এক কনস্টেবল। এই রাস্তায় নিয়মিত চলাচল করে বেসরকারি চাকরিজীবী তাহসীন মল্লিক। তিনি বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ সন্ধ্যার পরে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ দেখি না। যানজট লেগে গেলে টহল পুলিশকে দেখেছি সেটা নিরসনে কাজ করতে।’
কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট মোড়েও থাকে না ট্রাফিক। শুক্রবার রাতে এই সড়ক ধরে বাড়ি ফেরেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পিয়াস সরকার। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করি। সন্ধ্যার পরে কোনো ট্রাফিক পুলিশ দেখি না।’ এ ছাড়া রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রামপুরা, বাড্ডা, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে একই কথা।
