আবারও মোবাইল ইন্টারনেট (ফোর-জি নেটওয়ার্ক) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু থাকলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যবহারকারী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসি’র সচিব নূর-ই-খাজা আলামীন দেশ রূপান্তরকে জানান, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে কোনও ধরনের নির্দেশনা দেওয়ার কথা তার জানা নেই।
তবে অপারেটরদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, দুপুর পৌনে ১টার দিকে সরকারি নির্দেশে তারা ফোর-জি নেটওয়ার্ক তথা বন্ধ রেখেছেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এটি বন্ধ থাকবে।
ফোর-জি বন্ধ থাকলে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় না। তখন শুধু কথা বলা যায়। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৫৪ লাখেরও বেশি। যার মধ্যে সাড়ে ১১ কোটির বেশি ব্যবহারকারী মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘ইন্টারনেট বন্ধ হলে আমাদের ব্যবসার বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়। আবার আন্দোলনকারীরা মনে করেন অপারেটররা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। সেজন্য তাদের অনেকেরই ক্ষোভ অপারেটরদের ওপর। কিন্তু সরকারি নির্দেশের বাইরে যাওয়ার তো আমাদের সুযোগ নেই। চলমান পরিস্থিতিতে অপারেটররাও খবু অসহায় হয়ে পড়েছে।’
এদিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু থাকলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছেন না বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। কোনও কোনও এলাকায় ব্রডব্যান্ডের গতি খুবই কম।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সংঘাতের জেরে গত ১৭ জুলাই রাত থেকে ফোরজি নেটওয়ার্ক বা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন ১৮ জুলাই রাতে বন্ধ হয়ে যায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও। এর আগে বিভিন্ন সময় সংঘাত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এলাকাভিত্তিক ফোরজি সেবা বন্ধ রাখা হলেও এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় দেশজুড়ে মোবাইল নেট বন্ধ থাকল। পরে ২৩ জুলাই থেকে ধীরে ধীরে ব্রডব্যান্ড উন্মুক্ত করা হয়। টানা ১০ দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৮ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে মোবাইল ইন্টানেট সেবা চালু হয়। কিন্তু বন্ধ ছিল ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম। অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড সংযোগে ইউটিউব চালু থাকলেও মোবাইল ডেটায় তা বন্ধ ছিল।
গত ৩১ জুলাই বেলা ২টার পর থেকে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো চালু করা হয়। তবে গত শুক্রবার দুপুর সোয়া ১২টার পর মোবাইল নেটওয়ার্কে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্যাশ বন্ধ করা হয়। পাশাপাশি এই নেটওয়ার্কে টেলিগ্রামও বন্ধ করা হয়। সেদিন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার পর তা আবার চালু করা হয়েছিল।
সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আজ থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই আন্দোলনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষের মধ্যে মুন্সিগঞ্জে ২ জন এবং মাগুরায় একজন নিহত ছাড়ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এ অবস্থায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলো।
এর আগে ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের কারণে দুই সপ্তাহে তথ্যপযুক্তি, সফটওয়্যার, এফ কমার্স, ই-কমার্স খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। যারা এই ক্ষতির শিকার হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই তরুণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অনেকেরই আয়ের একমাত্র অবলম্বন ফেসবুক ও ইউটিউব।
এর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দেশের অন্যান্য খাতে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো-বহু বিদেশি ক্রেতার আস্থা নষ্ট হয়েছে। অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দেশের ভাবমুর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী এই ক্ষতি কতটা কাটিয়ে উঠা যাবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশেন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সফটওয়্যার সার্ভিসেস (বেসিস) এর সভাপতি রাসেল টি আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ‘লাইফ লাইন’ হলো ইন্টারনেট। দীর্ঘসময় ধরে ইন্টারনেট ও ফেসবুক বন্ধের কারণে সদূর প্রসারী বিপুল ক্ষতি হয়েছে। দেশের অভ্যান্তরে আর্থিক ক্ষতি নিরুপণের কাজ চলছে। কয়েকদিন পর এটা বলা যাবে। আনুমানিক কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে। কিন্তু বিশ্ববাজারে আইটি খাতে অন্তত হাজার কোটি টাকার উপরে ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্রেতা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এভাবে ২৫ শতাংশ ক্রেতাও যদি চলে যায় তাহলে তার ধাক্কা সামলাতে লাগবে অন্তত এক বছর।’
তিনি বলেন, আমরা একটা ‘জার্নির’ মধ্যে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সম্ভাবনাময় এই শিল্পটা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সহসা ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন। আার্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বহু মানুষের চাকরি হারানোরও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো বিদেশি ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি। কারণ দেশের মানুষকে বোঝানো গেলেও বিদেশিদের এই সংকটের কথা বোঝানো যাবে না।
তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এভাবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তা হলো-নানারকম গুজবের ডালাপালা ছড়াতে পারে মানুষ। ইন্টারনেট বন্ধ করে সাময়িক কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে মনে করা হলেও বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণই বেশি। সুতরাং ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।
বিশ্ববাজারে আইটি রপ্তানি খাতে বিশাল বাজার রয়েছে, যেখান থেকে গড়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। এর মধ্যে সফটওয়্যার সেবা, কলসেন্টার, ফ্রিল্যান্সিংসহ নানা কাজ রয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ থাকার কারণে এই খাতে বড় ক্ষতি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৭ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন যারা আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেন। এর মধ্যে নিয়মিত কাজ করেন প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সার, যাদের বেশিরভাগই তরুণ। এদের একেকজনের প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। বছরে গড়ে আয় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফেসবুককে কেন্দ্র করে দেশে প্রায় তিন লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। খাবার, পোশাক, গয়নাসহ নানা পণ্য অনলাইনে বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। বিশেষ করে করোনার সময় চাকরি হারিয়ে অনেকেই ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেছিলেন। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফেসবুকের মাধ্যমে নানারকম পন্য বিক্রি করে সংসার চালান অনেকেই। ফেসবুক বন্ধ থাকায় গত কয়েক দিন তাদের বেচাকেনা বন্ধ ছিলো। নতুন করে আবার ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ায় তারা বিপাকে পড়বেন।
ই-কর্মাস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সদস্য ইকবাল বাহার জাহিদ ‘নিজের বলার মত একটি গল্প ফাউন্ডেশন’ নামে একটি অনলাইন প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছেন, যেখানে কয়েক লাখ তরুণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পন্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ইকবার বাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরি-বাকরি না করে বহু তরুণ অনলাইনের মাধ্যমে নিজেরা কিছু করার চেষ্টা করছিল। তাদের মূল ব্যবসা ফেসবুককেন্দ্রিক হওয়ায় তারা ভীষণভাবে হতাশ, চিন্তিত কারণ এই সময়ে তাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ। অনেকেরই খাবার টাকা নেই। বাসাভাড়া কিভাবে দেবেন তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
ফেসবুকের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রির ব্যবসাকে বলা হয় এফ-কমার্স। এ খাতভিত্তিক নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্সের (উই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬ লাখের মতো এফ-কমার্স উদ্যোক্তা রয়েছেন। চলমান পরিস্থিতিতে এফ-কমার্স খাতে ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
চাকরিবিষয়ক ওয়েবসাইট বিডি জবস’র প্রতিষ্ঠাতা ও বেসিসের সাবেক সভাপতি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ফাহিম মাশরুর দেশ রূপান্তরকে জানান, ফেসবুকসহ ব্যবহার করে যেমন ভুল তথ্য ছড়ানো হয়, সেই সঙ্গে ইতিবাচক বিষয়গুলোও প্রচার করা হয়। ফেসবুকভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ জড়িত। যারা বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। দেশে যে পদ্ধতিতে ফেসবুক বন্ধ করা হয়েছে তা কাম্য নয়। এভাবে নিয়ন্ত্রণ করে কোনও সমাধান হবে না। সরকার তথ্য অবাধ করলে গুজব ছড়ানোর সুযোগ কম থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট বন্ধের সময়ে গুজব আরও বেশি ছড়িয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্যের অবাধ প্রবাহ থাকলে মানুষের সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ বেশি থাকে।
ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) সূত্র জানিয়েছে এ খাতে প্রায় ৫ লাখ উদ্যোক্তা ও ১৫ লাখ কর্মী রয়েছেন। ইন্টারনেট ও ফেসবুক বন্ধ থাকায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
