থানা প্রাঙ্গণে পড়ে ছিল ১৩ পুলিশ সদস্যের লাশ

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৪, ১০:০২ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগের প্রথম দিনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশব্যাপী ১৪ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলার ঘটনায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত থানায় থানাটিতে এমন তাণ্ডব চালানো হয়। অন্যদিকে কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ  হাইওয়ে থানার এক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। 

এ ছাড়া হামলা-সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য। ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের ২৭ থানা, ফাঁড়ি, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও রেঞ্জ অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় পুলিশ হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তর ও রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি বিজয় বসাক।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় লোকজন জানান, এনায়েতপুর থানার সামনে ও ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল পুলিশ সদস্যদের মরদেহ। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সেখানে পড়ে থাকা মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলা সদর থেকে পুলিশ এসে মরদেহগুলো উদ্ধারের চেষ্টা এবং তাদের নাম-পরিচয় ও পদবি শনাক্তের কাজ চলছে বলে পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে জানা গেছে, নিহতের মধ্যে এনায়েতপুর থানার ওসি আবদুর রাজ্জাক ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সুশান্ত কুমার সাহা রয়েছেন। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অপারেশনস অ্যান্ড ক্রাইম) বিজয় বসাক ১৩ মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়ে বলেন, সন্ধ্যা ৭টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য সদস্যরাও তাদের সঙ্গে রয়েছেন। তারা থানায় গিয়ে ১১টি মরদেহ পেয়েছেন। এর মধ্যে আটটি মরদেহ মসজিদের পাশে স্ত‚প করা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনটি মরদেহ পাওয়া গেছে পুকুরে। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এখনো নিখোঁজ বলে তিনি জানান।

এনায়েতপুর হাট কমিটির সহসভাপতি মোকতার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘বেলা ১১টার দিকে তিন থেকে চার হাজার আন্দোলনকারী ও বিএনপিজামায়াতের নেতাকর্মী থানা ঘেরাওয়ের পর ভাঙচুর শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ ছাদে উঠে আত্মরক্ষায় রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ও গুলি ছুড়লে অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী আহত হয়। পরে তারা থানার ভেতরে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। আহত অবস্থায় একে একে সবাই থানা চত্বরে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।’ এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সৌদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাশেদুল হাসান সিরাজ বলেন, ‘যতদূর জেনেছি, থানায় ৩৬ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। হয়তো আশপাশে আরও কয়েকজন আহত অবস্থায় পালিয়ে বা ভেতরেও থাকতে পারেন। তাদেরও খুঁজে বের করা উচিত।’ 

সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল বলেন, এনায়েতপুর থানার ঘটনাটি মর্মান্তিক। আন্দোলনকারীদের মারধরে নিহত এ পুলিশ সদস্যরা নিহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মোহাম্মদ হান্নান মিয়া বলেন, ‘প্রথমে হাজারখানেক মানুষ দল বেঁধে থানার দিকে আসে। সেখানে তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলে যায়। 

পরে কয়েকশ মানুষ থানায় এসে হামলা চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত ১১-১২ জন পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।’ এদিকে এক দফা দাবিতে আন্দোলনকারীরা সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সাধারণ জনতা এবং জেলা বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এ সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রঞ্জু রহমান নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি শহরের পৌর এলাকার মাসুমপুর মহল্লার মাজেদ রহমানের ছেলে ও জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক। অন্য দুজন হলেন শহরে গয়লা মহল্লার গনজের আলীর ছেলে সুমন শেখ (২৮) ও একই মহল্লার মৃত আসু মুন্সীর ছেলে আবদুল লতিফ (৪২)। 

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরি, সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাত ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য চয়ন ইসলামের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার সাংবাদিকসহ নিহত হয়েছেন আরও ছয়জন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো তথ্য অনুসারে, আক্রান্ত পুলিশ কার্যালয়, থানা ও ফাঁড়িগুলো হলো ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, বগুড়ার সদর, দুপচাঁচিয়া এবং শেরপুর থানা ও নারুলী পুলিশ ফাঁড়ি। জয়পুরহাট সদর, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের গোড়াই হাইওয়ে থানা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও আশুগঞ্জ থানা, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর থানা, হবিগঞ্জের মাধবপুর ফাঁড়ি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিস, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং দিনাজপুর সদর থানা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত