বুক ভরে নিঃশ্বাস উল্লাস, বাড়াবাড়ি

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৪, ০৩:৩৮ এএম

রাতটা ছিল দিনের মতো, কেউ ঘুমায়নি। ভোর হতেই লং মার্চ, লং মার্চ, সরকার পতনের এক দফা দাবি নিয়ে লং মার্চ। সারা দেশের মানুষ এসে হাজির হয়েছিল রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখতে পারলেও আর পারল না আর। মানুষের স্রোত যেতে চায় শাহবাগে, গণভবনে, শহীদ মিনারে। যে শহীদ মিনার এক দিন আগেই এক দফা দাবিতে পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে।

ততক্ষণে নানা জায়গায় জানা গেছে, সেনাবাহিনী কোনো গুলি ছুড়বে না জনগণের দিকে; জানা গেছে, নানা জায়গায় পালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এরপর আর মুক্তিকামী জনতার বাঁধ ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। আমি রওনা হয়েছিলাম আবদুল্লাহপুর থেকে, শাহবাগ আসতে আসতে সময় লাগল হেঁটে প্রায় চার ঘণ্টা। উত্তরায় থাকতেই শোনা গেল প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেছেন শেখ হাসিনা। জনতা ফেটে পড়ল উল্লাসে, তারা যেন প্রায় সবাই নেমে এলো রাস্তায়। তাদের মুখে স্লোগান ‘পলাইছে রে পলাইছে, খুনি হাসিনা পলাইছে’।

রাস্তায় জনগণের জন্য কোনোভাবেই যানবাহন চলতে পারছিল না। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তারা চিৎকার করে গাইছে দেশের গান, রক্তে আগুনে প্রতিরোধ গড়ো রক্তে আগুনে প্রতিরোধ গড়ে নয়া বাংলার নয়া সকাল। কে নেই এই আনন্দ মিছিলে। সব বয়সের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের থেকে মুক্তির আনন্দে তারা জড়িয়ে ধরছিল একে অন্যকে। সেনাসদস্যদের ফুলও দিতে দেখলাম মাইলস্টোন কলেজের কিছু ছাত্রীকে। জসীমউদদীনে দেখা গেল প্রেমিকা জড়িয়ে ধরছে প্রেমিককে। জনতা তাদের ঘিরে স্লোগান আর হর্ষোল্লাসে অভিনন্দন জানাচ্ছে। তাদের মুখে তখন স্লোগান ‘এই মাত্র খবর এলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো’।

৮৯ বছর বয়সী গাজীপুরের সাতাইশ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী বলছিলেন, ‘এ এক অন্যরকম ইতিহাস, এই দিন দেখব ভাবি নাই, আমার মনে হচ্ছে আমি ১৬ ডিসেম্বর ৭১-এ ফিরে গিয়েছি।’ তিনি কাঁদছিলেন আর শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন, আশীর্বাদ দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘তোমরা শুধু জামায়াত-শিবিরকে ঢুকতে দিও না।’ তিনি মনে করেন, নতুন স্বাধীন বাংলাদেশকে ফিরে নিয়ে যেতে হবে ৭২-এর সংবিধানের বাংলাদেশে।

৪ আগস্ট রাতে ঘুম হয়নি আইনজীবী ফারহানা আলমের। তিনি এসেছেন মেয়েকে নিয়ে, যাবেন শহীদ মিনার। জনস্রোতে দাঁড়িয়ে আনন্দে ফেটে পড়ছিলেন তিনি। দিচ্ছিলেন স্লোগান ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।’

জানতে চাইলে বললেন, ‘ভাই, এখন নিঃশ্বাস নিতে পারছি। এ কদিন দমটা আটকে ছিল। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন বৃথা যাবে না, সারা দেশের মানুষ তাদের সঙ্গে আছে। আমি সবার আগে সাঈদসহ সব শহীদের হত্যার বিচার চাই, হাসিনার প্রত্যক্ষ মদদে যে বেনজীর আর ৪০০ কোটি টাকার মালিক পিয়নরা সম্পদের পাহাড় গড়েছে, তাদের সম্পদ ফিরিয়ে আনতে চাই, দুর্নীতির অবসান চাই, এই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের সবার বিচার চাই।’

নানা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছিলেন বিজয় মিছিলে। তাদের স্লোগানে স্লোগানে উঠে আসছিল শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের নানা দিকগুলো। দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র এমনকি ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে আঁতাত করার বিষয়গুলোও তুলে ধরছিলেন জেন-জিরা। প্রত্যেক মানুষের মুখ ছিল উজ্জ্বল, তারা দৃপ্ত ছিলেন আত্মনির্ভরশীল পদভারে; তাদের আত্মবিশ্বাস এমন যে, তারা বলছিলেন ‘এ আমাদের নতুন স্বাধীনতা, এই দেশকে আমরা ভালোবাসি, আমরা একটা মেধাভিত্তিক নতুন দেশ গড়ব।’

মিরপুরের ১২, ১১, ১০ ও শেওড়াপাড়ায় আশপাশের প্রায় সব বয়সী শ্রেণি-পেশার জনতা নেমে এসেছিল রাস্তায়। তাদের আনন্দ উল্লাসের মধ্যে দেখা যায় কেউ কেউ গণভবন থেকে লুট করে আনা মুরগি, তৈজস, আসবাব, ফ্যান, কম্পিউটার নিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা জায়গায় লুটপাটের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হতে দেখা যায় আনন্দ মিছিলকারী জনতারও।

বিজয় সরণিতে দেখা যায় বিক্ষুব্ধ জনতা জাতির পিতার ভাস্কর্যের গলায় দড়ি পরিয়ে ভূপাতিত করার চেষ্টা করছে। অনেকেই ছুড়ে মারছে জুতো। শিক্ষার্থীদের একটি দলকে সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিবৃত্ত করতে গিয়ে বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখলাম। সংসদ ভবনের মণিপুরীপাড়া এলাকায় জনতা জ্বালিয়ে দেয় অনেক সরকারি গাড়ি।

ফার্মগেট মোড়ে জনজটের ভেতর দিয়ে সেনাবাহিনীর একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে মাইকে ঘোষিত হচ্ছিল গুলি খাওয়া একজন আহত আছেন এখানে, রাস্তা খালি করে দেন। দেখা গেল সেই ভ্যানের পেছনে সেনাপরিবেষ্টিত হয়ে আছেন শেখ হাসিনা আমলে নানা অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলা গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকিকে। দেখামাত্র জনতা ‘সাকি ভাই জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল, জোনায়েদ সাকিও হাত নেড়ে জনতার অভিবাদনের জবাব দেন। তিনি হ্যান্ডমাইকে বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সব হবে, আগে আমাদের হিন্দু বন্ধুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, লুটতরাজ বন্ধ করতে হবে।’

প্রায় সব জায়গায় জনতার হাতে ছিল ক্যামেরা অন করা মোবাইল। এই অভূতপূর্ব দিনের স্মারক হিসেবে তারা ছবি তুলছিলেন, সেলফি তুলছিলেন। প্রতিটি মানুষ মাথা উঁচু করে, ভয়হীনভাবে হেঁটে চলছে। গুটিসুটি হয়ে থাকা মানুষগুলো, ভয় আর অসম্মানে থাকারা ফেটে পড়ছিলেন উল্লাসে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ!!!

দেখা হলো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫৪ বছর বয়সী এক লেখকের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সবার আগে দালালমুক্ত করতে হবে সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানগুলো, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি। বাংলাদেশ হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, এই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই উদ্ধার করছে আওয়ামী লীগের হাত থেকে। তারা মুক্তিযুদ্ধ ও জয় বাংলাকে যত বিপদে ফেলেছে, তা আর কেউ ফেলেনি।’

একটু এগোতেই কারওয়ান বাজারে দেখলাম মিষ্টি বিতরণ করছে আনন্দিত মানুষের দল। উল্লাসের মধ্যেই তাদের কেউ কেউ বলছিলেন, কেমন বাংলাদেশ তারা চান। বৈষম্যহীন মেধার মূল্যায়ন হয় এমন বাংলাদেশ চান বলছিলেন বিএএফ শাহীন কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সামিয়া নিঝুম। তার ভাষায়, ‘আমাদের বাংলাদেশে চাটুকার আর চোরদের জায়গা হবে না। সব মনে রেখেছি, সব হত্যার বিচার করা হবে।’

বাংলা মোটর মোড়েও ছিল মানুষের ঢল। তখন বাজে প্রায় ৪টা, তারা বেশিরভাগ তখন শাহবাগ ছেড়ে যাচ্ছেন গণভবনের দিকে। তাদেরই একজন ব্যাংকার রাসেল আহমেদ বলছিলেন, ‘ছাত্রদের হাত ধরে আজকের ঐতিহাসিক দিনটাকে আমরা যেন আমাদের এমন কোনো কর্মকান্ডের মাধ্যমে কালিমালিপ্ত না করি। সব ধরনের হত্যা, প্রতিশোধ এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ও সম্পদে ধ্বংসযজ্ঞ, অগ্নিকান্ড, লুটপাট থেকে বিরত থাকি। এগুলো আমাদেরই সম্পদ, আমাদের করের টাকাতেই এগুলো বানানো। দেশের সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য, বিদ্বেষের হতে পারে না। ছাত্রদের এত কষ্টের, এত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অর্জন আমরা বিফলে যেতে দিতে পারি না। না হলে, জাতি হিসেবে এর থেকে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। তবে এটা সত্য, এখন মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নেওয়াও আনন্দের।’

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত