অতি দ্রুত দেশের জনগণের সুরক্ষা এবং সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা হয় ছাত্ররা অসহযোগের ডাক দিলেও তাদের বাদ দিয়ে আইএসপিআর কোন ক্ষমতাবলে সবকিছু খোলার ডাক দিল?
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহবাগ থেকে সহিংসতাবিরোধী মিছিল নিয়ে স্বাধীনতা ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি প্রশ্ন তোলে শিক্ষকদের এ সংগঠনটি। সোমবার শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ এবং ভারত চলে যাওয়ার পর সারা দেশে ছাত্র-জনতার বিজয় উদযাপনের ফাঁকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতনসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাসহ স্থানীয় পর্যায়ে নানা মানুষের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনাও ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বহু মানুষ নিহত হয়েছে, হয়েছে সম্পদহানি। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে এর পরবর্তীকালে একটি সংবিধান সভা গঠিত করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে এর আলোকে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চার শিক্ষক। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘একটি চরম নিপীড়নমূলক ও ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা জন-আন্দোলন শুরু করে। বৈষম্যের পরিবর্তে সাম্যের দাবি তোলায় তাদের শিকার হতে হয় নির্মম জুলাই হত্যাকা-ের। সরকারি হিসাবে ৩০০ জনের বেশি এবং বেসরকারি হিসাবে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী, শিশু থেকে বৃদ্ধ, পুরুষ ও নারী এবং সব শ্রেণি-পেশার নাগরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর গু-াদের হাতে নৃশংস ও নারকীয় হত্যাকান্ডের শিকার হন।
এতে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি একটি নিপীড়নমূলক ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে এ মুক্তি অর্জন রাষ্ট্রকে মেরামত করে একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী, অসাম্প্রদায়িক, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকারী রাষ্ট্রে রূপান্তরের কঠিন পথ আমাদের সামনে। মুক্তি এখনো অর্জিত হয়নি। ১৯ জুলাইয়ের হত্যাকান্ডের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে মাঠে মোতায়েন করার পরও পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হতে থাকে এবং গত রবিবার সারা দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক (অফিশিয়াল হিসাবে ১০২ জনের বেশি) মানুষ নিহত হয়। অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি এবং তিন দিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সরকারের এ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে ৫ আগস্ট রোড টু ঢাকা মার্চের ডাক দেয়।’
শিক্ষক নেটওয়ার্ক উল্লেখ করেছে, এ সংকটময় মুহূর্তে আমরা বিস্মিত হয়ে ঢাকা শহরসহ সারা দেশে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি আর চেইন অব কমান্ডের পুরোপুরি অনুপস্থিতি লক্ষ করি। বিভিন্ন অঞ্চলে ও রাজধানীতে মোতায়েন সেনাসদস্যরাও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়ভাবে আমাদের নজরে পড়ে।
ক্ষমতার বদলে যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে আলাদাভাবে কোনো পাঠ ছিল কি না প্রশ্ন তুলে সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়, কোনো পরিণতি তারা আগাম-আন্দাজ করতে পারেননি? এতগুলো গোয়েন্দা সংস্থা তাহলে খামোকা আছে কেন? আর যদি কোনো রিডিং থেকে থাকে, তাহলে শেখ হাসিনার পরিণতির পর কীভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা হবে, তার একটা আউটলেট তারা তৈরি করেননি কেন? এ পরিস্থিতিতে আমাদের এ-ও মনে হয়েছে যে, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে ডাম্প করা হয়েছে। ‘ওয়ার-ক্যাজুয়ালটির’র মতো তাদের ক্রুদ্ধ জনতার সামনে অরক্ষিত রাখা হয়েছে। জানমালের হেফাজতের যে ওয়াদা সেনাপ্রধান করেছেন, তার জন্য আমরা সেনাবাহিনীকে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার আগেই পেশাগত কর্তব্য পালনের আহ্বান জানাই।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্বেগ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘মধ্যরাত অবধি আমরা জানি যে, সারা দেশে পুলিশের অনুপস্থিতি বজায় ছিল এবং সেনাবাহিনীর টহলও নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। এ ছাড়া গতকাল (সোমবার) দেশের বেশ কিছু স্থানে পুলিশ গুলি করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘোরতর আশঙ্কা করছি আমরা। পুলিশের অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনী নাগরিকদের সুরক্ষায় এগিয়ে না এলে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের গণঅভ্যুত্থান নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। সাময়িক বিজয় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চূড়ান্ত পর্যায়ে না গিয়ে, একটি পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুবিধাবাদী, মতলববাজ, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শক্তির কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আবার কুক্ষিগত হয়ে যেতে পারে। আমরা চাই অতি দ্রুত একটি সুস্থ-সভ্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেশে চালু হবে।
