হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই বিভিন্ন গ্রুপ, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি-কর্তাদের অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া ও দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। তাদের মতে নতুনভাবে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে বৈষম্য ও দুর্নীতির কোনো স্থান নেই। প্রয়োজন নেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদেরও।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে অফিস ছেড়ে পালিয়ে যান চার ডেপুটি গভর্নরসহ ছয় শীর্ষ কর্মকর্তা।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক এবং কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য পূরণ করে আসছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা। একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কখনোই এ রকমটা হতে পারে না। শীর্ষ কর্মকর্তাদের এতদিন অনিয়ম-দুর্নীতি পরিদর্শনের কাজ করতে পারেননি অধীনরা।
পরে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক সাংবাদিকদের জানান, পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যে পদত্যাগের দাবি করেছেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সদ্য পদত্যাগী সরকার। ফলে নতুন কোনো সরকারকেই তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা গতকাল প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছেন, যেমন পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন, পে-স্কেল, সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ ইত্যাদি।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হতে আরও সময় লাগলে কী হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মেজবাউল হক বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকে দুই ধরনের কাজ হয়; প্রথমত, দৈনন্দিন কার্যক্রম; দ্বিতীয়ত, নীতিগত। দৈনন্দিন কার্যক্রম বিভাগীয় প্রধানরাই চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু সরকার না থাকলে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় না। এখন মূলত দৈনন্দিন কার্যক্রমই চলবে।
এদিকে গতকাল সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের সামনে হট্টগোল করতে দেখা যায় কর্মকর্তাদের। তাদের দাবি স্বৈরাচার সরকারের নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের কারণে তারা নানা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
আন্দোলনকারীদের একজন জানান, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ২০২৩ সালে বেশি মুনাফা করেছে সোনালী ব্যাংক। কিন্তু এবার তাদের দেওয়া হয়েছে মাত্র তিনটি বোনাস।
এর আগে গত মঙ্গলবার বিভিন্ন দাবি নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। এ সময় তারা এস আলম গ্রুপের নিয়োগকৃত এক্সিকিউটিভদের পদত্যাগ, প্রমোশন বঞ্চিতদের সঙ্গে ন্যায়বিচার, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগকৃতদের নিয়োগ বাতিলসহ বিভিন্ন দাবি জানান। পাশাপাশি ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের পর পদায়ন পাওয়া এক্সিকিউটিভদের (নির্বাহী কর্মকর্তারা) ঢুকতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তারা। কারণ এসব নির্বাহী কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপের নির্দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন (আইবিএফ) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আইবিএফ পরিচালিত সব প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালে ১ জানুয়ারি থেকে স্বেচ্ছায়, জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলকভাবে যেসব জনবলকে অব্যহতি প্রদান অথবা গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের সবার বরাবরে যে পত্র ইস্যু করা হয়েছিল তা বাতিল করা হলো। অর্থাৎ তাদের ওই তারিখ থেকে পুনর্বহাল করা হলো। শিগগিরই ওইসব জনবলের নামে পত্র ইস্যু করে কাজে যোগদানের জন্য জানানো হবে।
গত কয়েক বছরে নীতিমালা পরিবর্তন করে গ্রাহকদের সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু অসৎ শীর্ষ কর্মকর্তা। এতে ব্যাংক খাতের সুশাসন ভেঙে পড়েছে। হয়েছে অর্থ পাচার ও টাকার অপব্যবহার। গত মার্চের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ শতাংশ। কিন্তু সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডি বলছে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের যে হিসাব প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা প্রকৃত চিত্র নয়। পুনঃতফসিল, অবলোপন ও অর্থঋণ আদালতের হিসাব যোগ করলে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
