ঢাবি প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসছে পরিবর্তন!

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৪, ০৭:০২ এএম

সরকার পদত্যাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ঢাবির উপাচার্য বহাল থাকছেন না পদত্যাগ করছেন। দুই দশকের বেশি সময়ের ইতিহাস বলছে, ‘রাজনৈতিক পরিচয়ে’ নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা ক্ষমতার পালাবদলের পরপরই দায়িত্ব ছাড়েন কিংবা ছাড়তে বাধ্য হন। সর্বশেষ ঢাবির ২৯তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের নেতা অধ্যাপক মাকসুদ কামালকেও কি একই পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে? গুঞ্জন আছে শুধু উপাচার্য নন, প্রক্টর, উপ-উপাচার্যসহ শীর্ষ প্রশাসনিক পদে থাকা শিক্ষকদেরও সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।

সূত্র বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে থাকা দু-একজন শিক্ষক ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করার কিংবা দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাকিরা নতুন সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে দায়িত্ব পালন নিয়ে শঙ্কায় আছেন সবাই। এদিকে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলায় এবং পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশই দাবি জানিয়ে আসছেন ভিসি এবং প্রক্টরের পদত্যাগ। সমন্বয়কদের ৯ দফা দাবির মধ্যেও ছিল এটি।

ইতিহাস বলছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার ৬ দিনের মাথায় তৎকালীন উপাচার্য বিএনপিপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ অব্যাহতি চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান।  ‘সৌজন্যবোধ এবং পদের মর্যাদা রক্ষায়’ অব্যাহত চান বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা গ্রহণ করলে ১৫ জানুয়ারি নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান আওয়ামীপন্থি নীল দলের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আরেফিন সিদ্দিক।

এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দিনের বেলা দায়িত্ব নিয়ে মধ্যরাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগ দেন আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী। তখনকার আওয়ামীপন্থি উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী অনেকটা বাধ্য হয়েই দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এরশাদের সময় নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য মনিরুজ্জামান মিঞা বিএনপি সরকারের প্রায় আড়াই বছরের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শামসুন্নাহার হলে ছাত্রীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের ঘটনায় গড়ে ওঠা আন্দোলনের মুখে দায়িত্ব নেওয়ার ৯ মাসের মধ্যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন আরেক উপাচার্য আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী। তার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. ইউসুফ হায়দার। দেড় মাসের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর অধ্যাপক ইউসুফ হায়দার দায়িত্ব ছাড়লে ২৩ সেপ্টেম্বর ২৬তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ফয়েজ।

শিক্ষার্থী ও সমন্বয়করা বলছেন, ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলায় ২৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হন। ১৭ জুলাই ক্যাম্পাসে পুলিশের হামলার জন্য দায়ী উপাচার্য এবং প্রক্টর। এরপর থেকেই মূলত শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে এই দুই শিক্ষকের পদত্যাগ দাবি করেন। শুধু ছাত্ররা নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশও এ দাবি জানান। বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলন করে ঢাবি প্রশাসনেরই পদত্যাগ দাবি করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নয় দফার এক দফা ছিল ঢাবি উপাচার্য এবং প্রক্টরের পদত্যাগ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-প্রক্টর সেখানে অসমর্থন এবং অসহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের ওপর তারা পুলিশ, বিজিবি এবং র‌্যাব লেলিয়ে দিয়েছে। ভিসি নিজে বাহিনী ডেকে এনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার হুকুম দিয়েছে। ১৭ তারিখ গায়েবানা জানাজা এবং কফিন মিছিলে ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি, টিয়ার শেল চালানোর হুকুমের আসামি হিসেবে ভিসি-প্রক্টরের নির্লজ্জতা প্রকাশ পায়। ছাত্রদের রক্ষা না করে বরং ছাত্রদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়ার দায় কাঁধে নিয়ে ভিসি-প্রক্টরের নিজ দায়িত্বে পদত্যাগ করা উচিত।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাবি উপাচার্য এবং প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি আমাদের এখনো রয়েছে। যে ভিসি এবং প্রক্টর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারেন না, লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করেন, তাদের আমরা চাই না। শিক্ষার্থীদের রক্তের ওপর কেউ দায়িত্বে থাকতে পারেন না। ক্যাম্পাসে আমাদের অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, ওনারা কোনো ভূমিকা রাখেননি; বরং হামলাকারীদের পক্ষে ছিলেন। এই দুজন ছাড়াও যারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, কিংবা শিক্ষার্থীদের পক্ষে ছিলেন না, তাদেরও পদত্যাগ চাইতে পারে শিক্ষার্থীরা। নতুন সরকারের কাছে আমরা সেই অনুযায়ী দাবি জানাব। আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসন চাই।’

একটি সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ পাঁচ তথা ভিসি, প্রক্টর, উপাচার্য, ট্রেজারার এবং প্রভোস্টদের সবাই কিংবা কেউ কেউ পদত্যাগ করবেন কিংবা তাদের সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কেউ কেউ এরই মধ্যে ছাড়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। তারা মনে করছেন এই মুহূর্তে এটা সময়ের দাবি। আর উপাচার্যসহ বেশিরভাগই তাকিয়ে আছেন নতুন সরকারের দিকে। তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই মেনে নেবেন।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন বলে একটি গুঞ্জন উঠেছে। তবে বিষয়টি সঠিক নয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকার। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত উপাচার্য স্যার কোনো পদত্যাগপত্র দেননি। এমন কোনো আলোচনাও এখন পর্যন্ত হয়নি। প্রশাসনের অন্য কারও পদত্যাগের বিষয়ে জানাননি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হলেও ক্ষমতার লোভে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টররা তাদের পাশে দাঁড়াননি। আমরা মনে করি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারেননি যারা, নৈতিকভাবে তারা দায়িত্বে থাকার অধিকার হারিয়েছেন। এখন তারা পদত্যাগ করবেন কি করবেন না, এটা তাদের নৈতিকতার ওপর ছেড়ে দিলাম। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ার আগেই পদত্যাগ করা সম্মানের। সম্মান বজায় রেখে ওনাদের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।’

বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, প্রক্টর এবং যেসব হলের প্রাধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের পদত্যাগ দাবি করছি।’

পদত্যাগের গুঞ্জনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই সংবাদ সঠিক নয়। নতুন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে।’

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৯ জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাবিতে। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একজন উপাচার্য ৪ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার পি জে হার্টগ। তিনি ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সবশেষ ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত