দিকনির্দেশনা না থাকায় আ.লীগ কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৪, ০৭:০৯ এএম

আন্দোলনের মুখে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে দলের কোনো নেতাও নেই। আত্মগোপনে চলে গেছেন কেন্দ্রীয় সব নেতাসহ সহযোগী সংগঠন ও তৃণমূলের দায়িত্বশীল নেতারা। দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর বিশ্বাস ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি পরিস্থিতি অনুকূলে নিয়ে আসবেন। এত দ্রুত প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে কেউই তা ভাবতে পারেননি। হতাশায় আচ্ছন্ন কর্মী-সমর্থক ও অনুসারীরা। নিরাপত্তাহীনতাও প্রবলভাবে ঝেঁকে বসেছে তাদের ভেতরে। নেতাদের দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছেন কর্মীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিকনির্দেশনা পেলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মানসিকতা দেখাচ্ছেন কর্মী-সমর্থক গোছের সাধারণরা। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নীরব থাকায় কর্মী পর্যায়ের অভিব্যক্তি এমন পাওয়া গেছে, নিজেদের রাজনৈতিক এতিম বলে মনে হচ্ছে।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তিন দিন আগেও কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে যেসব কর্মী মাঠে সক্রিয় ছিলেন, নির্দেশনার অভাবে অনেকটা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। একই সঙ্গে সামনে আরও হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।

সোমবার শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর দেশের প্রায় সব জেলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয়। অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত হওয়ার খবর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে আতঙ্কে নেতাদের পাশাপাশি কর্মীরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতির ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের সময় মঙ্গলবার মধ্যরাতে জার্মানভিত্তিক একটি টিভি চ্যানেলের বাংলামাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেন, বর্তমানে তার নিজের বা শেখ পরিবারের কোনো ব্যক্তির রাজনীতিতে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। জয়ের এমন বক্তব্য নেতাকর্মীদের ভেতরে উদ্বেগ-হতাশা আরও বেড়ে গেছে। গতকাল বুধবার রাতে দেওয়া অন্য এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বলেছিলাম আমার পরিবার আর রাজনীতি করবে না। তবে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে হামলা হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দিতে পারি না। নতুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছাড়া সম্ভব নয়।

তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে। মঙ্গলবার তারা গোপালগঞ্জে মিছিল করেন। আর গতকাল টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্সে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার শপথ নেন তারা। তবে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতারা গা ঢাকা দিলেও মঙ্গলবার গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল শক্ত রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। ভৈরবেও প্রতিরোধ মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ।

একটি সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে নেতারা গ্রেপ্তার আতঙ্কেও আছেন। দুজন মধ্যম সারির নেতা বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে আমাদের আওয়ামী লীগ নেতাদের ধরপাকড় শুরু হবে। এ কারণে অনেকে দেশত্যাগেরও চেষ্টা করছেন। তবে কয়জন যেতে পারেন তা দেখার বিষয়।

এদিকে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি গণপিটুনিতে হত্যাকা- অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের পরিচয় জানলেই গণপিটুনির শিকার হতে হচ্ছে। এ ছাড়া বাসাবাড়ি লুটপাটও করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের চেনাজানা নেতাদের। বিনা বাধায় ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট ও বাড়ি-গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক দিনে। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদেই আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতারা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা সংকটে আত্মগোপনে চলে যান, কর্মীদের খোঁজ-খবর রাখেন না তাদের নেতা বানানোর পরিণতিই বরণ করতে হয়েছে আজকে। অযোগ্য-অথর্ব নেতাদের পদ দিয়ে, জাতীয় নেতা ও মন্ত্রী বানিয়ে কী লাভ হলো? দল যখন সংকটে আত্মগোপনে থেকে হলেও কর্মী-সমর্থদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো সাহস না থাকলে কীভাবে দল চলবে সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এদিকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সব নেতাই মোবাইল নাম্বার বন্ধ রেখেছেন, পরিবর্তন করে নতুন নাম্বার নিয়েছেন। নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়ে বসে আছেন। দেশত্যাগের সুবিধা খুঁজছেন টাকাওয়ালা নেতারা। কর্মী-সমর্থকের নিরাপত্তার কথা একবারও চিন্তায় আনেননি। নেতাদের দিকনির্দেশনাহীন রেখে গত চার দিনে আওয়ামী লীগের অবস্থা হয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনের মতো। রাজনীতিতে সংকট আসবে পালাতে হবে, আত্মগোপনে থাকতে হবেÑ এগুলো সবই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। কিন্তু কোটি কোটি কর্মী-সমর্থকের জন্য ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা রেখে যাবেন না এটা রাজনীতির কোনো কৌশল হতে পারে না।

৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা অন্তত ৬০ জন নেতার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন এ প্রতিবেদক। কিন্তু কোনো মাধ্যমেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে গত ৫ আগস্ট সকাল বেলায় একাধিক নেতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়। ওইদিন বেলা ৩টার পর থেকে কোনো নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

সরকার পতনের এক দফা দাবিতে সোমবার ‘মার্চ টু ঢাকা’ ডাক দেয় আন্দোলনকারীরা। সকাল থেকে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে ব্যারিকেড দিয়ে রাখেন সেনাসদস্যরা। দুপুর সাড়ে ১২টার ব্যারিকেড তুলে নেয় তারা। এরপর আন্দোলনকারীরা শাহবাগমুখী হতে থাকে। আন্দোলনকারীরা ঢাকায় ঢুকছেÑ এমন সংবাদ প্রকাশের পরেই আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নানা মাধ্যমে ফোন করেন এ প্রতিবেদককে। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে-বুঝতে ফোন করেন সেসব নেতা। আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, এমন পরিস্থিতি হতে পারে সেটা গত তিন-চার বছর ধরেই বুঝতে ছিলাম। কিন্তু আমরা তো দলীয় সভাপতির কাছে যেতে পারিনি। ওনাকে একটি মহল নানান পরামর্শ দিয়ে এ পথে নিয়ে গেছেন। এখন পরামর্শদাতারা কোথায় আছেন জানি না। দলটির আরেকজন বলেন, কিছু পাইনি। শুধু আওয়ামী লীগ করেছি। তবুও আত্মগোপনে থাকতে হচ্ছে। এখন আপাতত এক জায়গায় আত্মগোপনে আছি। এমন করে কয়দিন থাকতে পারব জানি না।

এদিকে হঠাৎ তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে দলের জন্য দুর্যোগ বলে দাবি করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। মধ্যম সারির এক নেতা বলেন, গত রবিবার নেতাদের আত্মবিশ্বাসের কথা শুনে আমাদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল যেকোনো মূল্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারব। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিপরীত অবস্থা দেখে আমরা চরম হতাশ ও দলের নেতাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছি। সময় আসলে তাদের কাছে জবাব নেওয়া হবে।

এদিকে এ পরিস্থিতিতে গা ঢাকা দেওয়া আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীরা আর্থিক সংকটে পড়তে শুরু করছেন বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই টাকাপয়সার জন্য নেতাদের মোবাইলে খুদে বার্তা দিলেও কোনো উত্তর পাননি। এতে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত